প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

‘গলদে ভরা’ প্রকল্প

editor
প্রকাশিত জুন ৩০, ২০২৬, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ
‘গলদে ভরা’ প্রকল্প

Manual8 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

মোট সেতু ৮২টি। কাজ শুরু হয়েছে ৪৬টির। প্রকল্পের শুরু চার বছর আগে। এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। সময় বাকি রয়েছে মাত্র এক বছর।

এখনো ১৬টি সেতুর নকশা তৈরিই হয়নি। ১ শতাংশ কাজও বাস্তবায়ন হয়নি ১৬টি সেতুর কাজ। বন্ধ রয়েছে ১২টি সেতুর নির্মাণ কাজ। দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকল্পের মোট কাজে অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি তদন্ত বিষয়ে আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কারচুপি ও দায়িত্বশীলদের কর্মসম্পাদনে অবহেলার নিদারুণ চিত্র। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের জন্য নিযুক্ত ঠিকাদাররা বালির পরিবর্তে মাটি ব্যবহার করেছেন। কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা পরামর্শকরা দায়িত্ব পালন না করায় মাঠপর্যায়ে কাজে চরম অরাজকতা বিরাজ করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, পরামর্শকরা এ পর্যন্ত ১৭ কোটি টাকা নিলেও মাঠে সময় না দিয়ে এলজিইডি সদর দপ্তরের এসি রুমে সময় পার করছেন। পরামর্শকদের এ রকম দায়িত্বহীন কাজ আর্থিক শৃঙ্খলা ও সরকারি নীতিমালার পরিপন্থি ও সরকারি তহবিলের চরম অপচয়। প্রতিবেদন সম্পর্কে এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, মনগড়া ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করা হয়েছে, তাই প্রকল্পের এই দশা!

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য বেশ নিবীড়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২২ সালের ২২ মার্চ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। খরচ ধরা হয় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ৩৫ উপজেলায় ৮২টি সেতু নির্মাণে এই সময় বেঁধে দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। শুরু থেকে (২০২২ সালের ১০ আগস্ট) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তার নেতৃত্বে ৪০ জন লোকবল রয়েছে। কাজের মান দেখভাল করতে ও কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাসে পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও ছয় মাস পর প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা করার নিয়ম রয়েছে। এই চার বছরে পিআইসি সভা হয়েছে ৪টি ও পিএসসি ৪টি। ফলে পুরো প্রকল্পজুড়ে গলদ থেকেই গেছে।

এই প্রকল্পের জন্য প্রকৃত অর্থে কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মনগড়া সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ফলে শুরু থেকে প্রকল্পটি গলদের মধ্য দিয়ে চলছে। প্রকল্পের মূল বাজেটে ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি খাতে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। তবে এলজিইডির নিজস্ব ডিজাইন ইউনিট দিয়ে এসব সেতুর নকশা তৈরি করা হয়েছে। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েটে) থেকে ভেটিং নেওয়া হয়। তবে অনেক সেতুতেই গলদ থেকে যায়। প্রকল্পের ডিজাউন ও পরিকল্পনার সময় হাইড্রোলজিক্যাল (জলবৈজ্ঞানিক) ও মরফোলজিক্যাল (ভূ-গঠনিক) তথ্য সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি, যা করা হয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে তা সংগতিপূর্ণ ছিল না।

Manual8 Ad Code

এদিকে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরামর্শকরা মাঠপর্যায়ে কাজ না করায় যথাযথ তদারকি হয়নি। এর ফলে উলম্ব (ভার্টিক্যাল) ছাড়ে ভুগছে ৫টি সেতু।

এদিকে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক শতাংশও বাস্তবায়ন হয়নি ১৫টি সেতুর কাজ। এগুলো হচ্ছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের ১টি, রাজবাড়ীর কালুখালীর ১টি, চট্টগ্রামের রাউজানের ১টি, জামালপুরের মাদারগঞ্জের ১টি, সরিষাবাড়ীর ১টি, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের ১টি, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের ১টি, নেত্রোকোনার কেন্দুয়ার ১টি, ঢাকার নবাবগঞ্জের ১টি, মানিকগঞ্জের ঘিওরের ১টি, সাটুরিয়ার ১টি, টাঙ্গাইলের বাসাইলের ১টি, মেহেরপুরের গাংনীর ১টি ও সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের ১টি সেতু নির্মাণের কোনো কাজই শুরু হয়নি এই চার বছরে। এসব সেতু ২০ মিটার থেকে শুরু করে ৫০০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হওয়ার কথা। এ পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার মিটার সেতু নির্মাণ হয়েছে, যার পেছনে খরচ হয়েছে ৪৫৪ কোটি টাকা। বাকি ১৪ হাজার ১৯৭ মিটার সেতুর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। কোনো সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণও করা হয়নি।

Manual2 Ad Code

 

পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের বাস্তব কারিগরি উপাত্ত ও জ্যামিতিক নকশার সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে কিছু প্যাকেজের বাস্তবায়নযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই প্রকল্পে ৪৭ পরামর্শকের মধ্যে ১৭ জনই ঢাকায় হেডকোয়ার্টারে অবস্থান করছেন। সারা দেশে কাজ হলেও তারা মাঠে সময় দেননি। এর ফলে মাঠপর্যায়ে লজিস্টিক ও টেকনিক্যাল গাইডেন্সের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রুটি আছে।

নিশ্চিত করা হয়নি নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিবিড় তদারকির অভাবে ঠিকাদাররা চুক্তির শর্ত ভেঙে যা ইচ্ছা তাই করছেন। গার্ডারে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়নি। কুমিল্লা সদর উপজেলায় গোমতী নদীর ওপর ৩১০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে চুক্তি ভঙ্গ করে বালির পরিবর্তে মাটি ও খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে। গার্ডারের রড দীর্ঘ সময় উন্মুক্ত রাখায় মরিচা পড়েছে। এই উপজেলার কালখের পাড়-জনতা বাজার সেতুতে ঠিকাদারের গাফিলতি দেখা যায়। সঠিক প্রক্রিয়ায় কিউরিং হয়নি সেখানে। তবে এই সেতুর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, কাজ হচ্ছে। ২০২৭ সালের জুনে পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে।

মাগুরা সদরে ফটকি নদীতে ভাবনহাতি ট্রিকারখালি সড়কে ১৫০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণেও ঠিকাদারের চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে কাজ হয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জে পাগলা নদীতে মনাকশাহাট রোডে ১৭২ মিটার সেতু নির্মাণে সম্পূর্ণ নদীতে বাঁধ দিয়ে সাটারিং করা হয়েছে। অন্য সেতু নির্মাণেও কিছু না কিছু ত্রুটি পাওয়া গেছে। ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় অগ্রগতি খুবই কম হয়েছে। ঠিকাদাররা ঢিলেমি করলেও তাদের চুক্তি বাতিলে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ অগ্রগতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হয়েছে ১২ শতাংশ। পরিবেশের কোনো সমস্যা না হলেও ৮২টি সেতুর মধ্যে ১৪টির টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

সার্বিক বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার বলেন, ‘সব প্রকল্পেই প্রথমে কাজের গতি বাড়ে না। আগে কম হলেও জুন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ১৫ শতাংশ হয়েছে। ৩টা সেতুর ডিজাইন বাকি রয়েছে। আগামী বছরের জুনে মেয়াদ শেষ হলেও ১ বছর সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। ফিজিবিলিটি স্টাডিতে কোনো ত্রুটি নেই। পরামর্শকরা যেখানে দরকার সেখানেই কাজ করছেন। ডিজাইনতো হেড অফিসে বসেই করতে হয়। তাদের ১৭ কোটি টাকা বেতন দেওয়া হয়েছে। সব ঠিকাদারই দায়সারা কাজ করছেন, এমনটা নয়। দুই একটা ব্যতিক্রম হতে পারে। কোথায় ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সারানো হচ্ছে।’

Manual3 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code