প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

‘জুলাই’ লোড ইন ইন্ডিয়া : ঢাকার অভ্যুত্থানের ছায়া কী এবার দিল্লিতে?

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ
‘জুলাই’ লোড ইন ইন্ডিয়া : ঢাকার অভ্যুত্থানের ছায়া কী এবার দিল্লিতে?

Manual5 Ad Code

 

Manual4 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নোকতা। ‘সামান্য’ সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, গুম-খুনের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে রাজপথে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার সরকারের পতন ঘটে।

Manual8 Ad Code

দুই বছর পর, ২০২৬ সাল। পতিত হাসিনার গন্তব্যে এবার তরুণদের বিক্ষোভ সেই একই সুতোই শুরু হয়— নিট (NEET-UG) পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে। ‘হাসিনা কৌশলে’ মোদি সরকার সেই বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে হিতেবিপরীতে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে আন্দোলন সাময়িকভাবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে পারলেও আখেরে তার ফল দীর্ঘ হয়নি। এবং বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নোকতা রাখা ‘হাসিনা পতন’ দৃশ্যের পুনদৃশ্যায়ন মোদি সরকারের ক্ষেত্রেও হতে পারে। তবে ভারত প্রদেশভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো হওয়ায় সে প্রশ্ন এখনও চূড়ান্ত উত্তরের দিকে যায়নি।

Manual2 Ad Code

শুরুটা শুরু থেকে করা যাক, নিট (NEET-UG) পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হয় রাজপথের দৃশ্যমান আন্দোলন এবং পরে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জেরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ— দুটি ঘটনাই ভারতের প্রশাসনিক জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দুবছর পেছনে ফিরে তাকালে এ দুটি ঘটনা বেশ পরিচিত মনে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে ‘জুলাই লোড ইন ইন্ডিয়া’—বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিবাদী চেতনা কি এবার ভারতের তরুণদের আন্দোলনেও প্রভাব ফেলছে? দুই দেশের আন্দোলনের মধ্যে কিছু কাঠামোগত মিল থাকলেও, দিল্লির বিক্ষোভকে ঢাকার অভ্যুত্থানের সরাসরি পুনরাবৃত্তি বলার সুযোগ এখনো নেই। বরং আন্দোলনের কারণ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরির ধরন বিশ্লেষণ করলে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের প্রতিবাদী রাজনীতির পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

নিট থেকে ভোটার তালিকা : দিল্লির আন্দোলনের বিস্তার

ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য আয়োজিত নিট-ইউজি পরীক্ষা ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ একপর্যায়ে শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহির প্রশ্নে বিস্তৃত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং তরুণদের সংগঠিত উদ্যোগ আন্দোলনকে রাজপথে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে। এ সময় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত একটি তরুণদের প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম আলোচনায় আসে।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার। অবশেষে ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এবং আন্দোলনকারীদের দাবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরকার কৌশলগতভাবে মেনে নেয়। দিল্লি আন্দোলনের হাল খবরে যাওয়ার আগে ঘটনা প্রবাহের এখানে থামতে হবে। কারণ, এখানেই জুলাই আন্দোলনের একটি সূক্ষসূত্র প্রবেশ করে গেছে দিল্লির যন্তর-মন্তরে। কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে একাধিক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ হত্যার পর তৎকালীন সরকার কোটা সংস্কারের সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কিন্তু ততদিনে দাবি-দাওয়া আর কোটায় থেমে থাকেনি— সরকার হয়ে ওঠেছিল ‘হত্যাকারী’ এবং জনগণ তার শেষ দেখার অপেক্ষায় রাজপথে। দিল্লিতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবির প্রথম সারিতে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা প্রশ্ন আন্দোলনে নতুন জোয়ার আনে।

অক্টোবরে দিল্লির বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে আরেকটি বিষয়—ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision—SIR)। নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়তে পারে বলে বিরোধী পক্ষ ও আন্দোলনকারীদের একাংশ অভিযোগ তোলে। তাদের আশঙ্কা, এ প্রক্রিয়া ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা তৈরি করতে পারে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে।

১০ অক্টোবর দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার এবং ব্যাপকসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়। এতে ভোটার তালিকার বিতর্কের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার প্রশ্ন সামনে আসে।

ঢাকার জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে কোথায় মিল?

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং ভারতের তরুণদের বিক্ষোভের মধ্যে বড় একটি মিল হলো—দুটিই নির্দিষ্ট একটি দাবি থেকে শুরু হয়ে বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্নে পৌঁছেছে। তবে এই সাদৃশ্য দুই আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতিকে এক করে দেখার ভিত্তি নয়।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন গতি পায় ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ের পর। ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কোটা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও আন্দোলন থামেনি। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, প্রাণহানি, গ্রেফতার এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন রূপ নেয়। ৫ আগস্ট তার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটে।

Manual6 Ad Code

অর্থাৎ, দুই দেশের অভিজ্ঞতায় অভিযোগ থেকে ক্ষোভ, ক্ষোভ থেকে সংগঠিত প্রতিবাদ এবং প্রতিবাদ থেকে সরকারের ওপর চাপ তৈরির একটি সাধারণ ধারা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের আন্দোলন যে পর্যায়ে গিয়ে সরকার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিয়েছিল, দিল্লির বিক্ষোভ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

তরুণদের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দুই দেশের আন্দোলনেই তথ্য প্রচার, জনমত তৈরি এবং প্রতিবাদ সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। দিল্লিতে অনলাইন প্রচার তরুণদের ক্ষোভকে দৃশ্যমান করেছে এবং রাজপথের কর্মসূচির সঙ্গে ডিজিটাল পরিসরের সংযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলন সমন্বয়, তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং সরকারি পদক্ষেপ নিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চাকরিপ্রত্যাশী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দেয়। দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির পর ক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে।

দিল্লির ক্ষেত্রেও অনলাইন থেকে রাজপথে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করলেই কোনো আন্দোলন জাতীয় গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই এর গতিপথ নির্ধারণ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অবশ্য দেখিয়েছে, তরুণদের ক্ষোভকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা কঠিন। কর্মসংস্থান, শিক্ষাব্যবস্থার ন্যায্যতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে অসন্তোষ জমতে থাকলে তা বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নিতে পারে। তবে সেই প্রতিবাদ সরকার পরিবর্তনের পর্যায়ে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনের বিকাশের ওপর।

ঢাকার অভ্যুত্থানের ছায়া, নাকি ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা?

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট নীতিগত দাবি কীভাবে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, রাজনৈতিক অধিকার ও সরকারের বৈধতা নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। দিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভেও তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, আন্দোলনের বিস্তার এবং ক্ষমতার সমীকরণ এক নয়।

‘জুলাই লোড ইন ইন্ডিয়া’ তাই আপাতত মোদি সরকারের পতনের পূর্বাভাস নয়; বরং ভারতের তরুণদের প্রতিবাদী রাজনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে একটি প্রশ্ন। আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয়, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী ও বিরোধী দল কতটা যুক্ত হয় এবং সরকার বিতর্কিত ইস্যুগুলোর সমাধানে কী পদক্ষেপ নেয়—তার ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ।

ঢাকার অভ্যুত্থানের সঙ্গে দিল্লির আন্দোলনের তুলনা প্রাসঙ্গিক। তবে সেই তুলনা অর্থবহ করতে হলে মিলের পাশাপাশি দুই দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্দোলনের পরিণতির পার্থক্যও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code