স্টাফ রিপোর্টার:
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডে কয়েকটি আলামতে গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খেজুরের বিচির নমুনায় মুগ্ধ দাসের, শসার টুকরায় সিদ্ধার্থ দাসের এবং বিড়ির শেষাংশে দুজনেরই ডিএনএ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলায় প্যাঁচানো গামছার নমুনায় শুধু মুগ্ধ দাসের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে।
এদিকে সেই হত্যাকাণ্ডে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন নমুনা ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব নমুনার ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে ওই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগর ডিবি কার্যালয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবির) পরিদর্শক জিন্নাত আলী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পাশাপাশি এ সময় আলোচিত এই চার খুনের মামলার তদন্ত, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান তিনি।
পরিদর্শক জিন্নাত আলী জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া আলামত, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে চার হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের জড়িত থাকারই প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে নিহত চারজন ও এই দুই আসামি ছাড়া ডিএনএতে অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি। মামলাটির ইতোমধ্যে তদন্তকাজ শেষ হয়েছে।
আগামী এক মাসের মধ্যে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে জানান জিন্নাত আলী।
Manual6 Ad Code
তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার ঢাকার সিআইডি কার্যালয় থেকে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩১ ধরনের নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। এসব নমুনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, খেজুরের বিচি, শসার অংশবিশেষ, ফল কাটার ছুরি, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, বেসিনের দাগ ও দুই আসামির রক্তের নমুনা।
আলামত মেলেনি ধর্ষণের
চার হত্যাকাণ্ডের পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও তার মা প্রীতিলতা চক্রবর্তী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত হতে মা-মেয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াবের নমুনাও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া আলামত, আদালতে দেওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া চারজন এবং পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়া ৫৬ জনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
Manual1 Ad Code
জিন্নাত আলী জানান, গণপতি চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজনে মিলে হত্যা করেন। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে হত্যা করেন মুগ্ধ দাস। তাদের কলেজপড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজন মিলে।
চারজনকে হত্যার কারণ সম্পর্কে জিন্নাত আলী বলেন, আসামিরা খবর পেয়েছিলেন গণপতি চক্রবর্তী অবসরের পর পাওয়া ৫০–৬০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বাড়িতে রেখেছেন। এছাড়া বাড়িতে অনেক স্বর্ণালংকারও রয়েছে বলে তাদের ধারণা ছিল। মূলত চুরির উদ্দেশ্যে তারা বাড়ির ছাদ দিয়ে প্রবেশ করেন। এরপর একে একে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন।
Manual6 Ad Code
জিন্নাত আলী আরও বলেন, মামলায় এলাকার শান্ত দাস, সীমান্ত দাস, দুলাল শর্মা ও কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাস আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৬ জন।
এর আগে, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ২৩ আগস্ট রংপুর নগরীর কোতোয়ালি থানায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে রংপুর কারাগারে পাঠায়। পরে আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তারা। মামলাটি প্রথমে নগরের কোতোয়ালি থানা-পুলিশ তদন্ত করলেও পরে ডিবি পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তদন্তের।
Manual3 Ad Code
উল্লেখ্য, রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত।