প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক তিন ধাপের কঠিন প্রতিযোগিতা পেরিয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পাওয়ার পরও সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা নেই। শেষ ধাপে এসে ‘ভেরিফিকেশন’ নামের আরেক পরীক্ষায় আটকে যেতে পারেন একজন চাকরিপ্রার্থী। কখনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পরিবারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় মামলা, আবার স্থায়ী ঠিকানায় জমি-বাড়ি না থাকার মতো কারণও জটিলতা তৈরি করছে। এমনকি কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, সেটিও তিনি জানতে পারেন না।
সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে সেই বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ৬৬৮ জনের মধ্যে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে বাদ পড়েন ৫৭ জন। গেজেটে তাদের বাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। যারা বাদ পড়েছেন তারা নিজেদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকার দাবি করে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি নিজ নিজ বিষয়ে মেধাক্রমে শীর্ষে থাকা কয়েকজনের নামও গেজেট থেকে বাদ পড়ে। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে ৫ অক্টোবর রাতে ৪০ জনের গেজেট প্রকাশ হয়। গত এক দশক ধরে বিসিএসের ফলাফল প্রকাশের পর চূড়ান্ত পর্যায়ে ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীদের আটকে দেওয়া নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত বিভিন্ন বিসিএসে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েন ২৫৯ জন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাদ পড়াদের ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট নতুন করে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই ১৫ বিসিএসের মধ্যে ৩৩তম বিসিএসে ২২ জন, ৩৪তমে ১৮, ৩৫তমে ২৬, ৩৬তমে ৫৩, ৩৭তমে ৪০, ৩৮তমে ১৮, ৩৯তমে ৪১ জনসহ মোট ২৫৯ জন ছিলেন। সরকারি সিদ্ধান্ত ও সংবাদ প্রতিবেদনে সূত্রে জানা যায়, নেতিবাচক পুলিশি বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে ৪৪তম বিসিএসেও পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ১ হাজার ৬৭৬ জনের মধ্যে ১ হাজার ৪৯০ জনকে নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। বাদ পড়েন ১৮৬ জন। আর ৪৩তম বিসিএসের ঘটনা ভেরিফিকেশন নিয়ে প্রশ্নটিকে আরও গভীর করে। পিএসসি ২ হাজার ১৬৩ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। প্রথম গেজেটে ৯৯ জন বাদ পড়েন। পরে সেই গেজেট বাতিল করে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৪০ জন এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে ‘সাময়িকভাবে অনুপযুক্ত’ ২২৭ জনসহ মোট ২৬৭ জনকে বাদ দিয়ে ১ হাজার ৮৯৬ জনের নতুন গেজেট প্রকাশ করা হয়। পরে বাদ পড়া ব্যক্তিদের একটি অংশকে পুনরায় গেজেটভুক্ত করা হয়েছে; সর্বশেষ ১৬২ জনের নাম নতুন করে গেজেটে এসেছে।
Manual4 Ad Code
৩৮, ৩৯ ও ৪০তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগ পাননি চিকিৎসক মো. সাইদুল ইসলাম। তার দাবি, নিজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলেও বাবা ও ভাইয়ের রাজনীতির কারণে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল।
Manual1 Ad Code
৪৯তম বিসিএসে (বিশেষ) সমাজকল্যাণ বিষয়ে প্রথম হয়েও গেজেটে নাম আসেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বেলালের। গেজেটে নাম না আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘৪৯তম বিসিএসে সমাজকল্যাণে প্রথম হয়েও আমার গেজেটে নাম এলো না। জুলাইয়ে সক্রিয় ছিলাম। আমার অপরাধ কী বুঝতে পারলাম না। এটাই কী আমার অপরাধ?’
একইভাবে ৩৮তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েও গেজেটে নাম না আসার কথা জানিয়েছেন বিল মারুফ বিন বারিক। তার ধারণা ছিল, তার বাবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভেরিফিকেশনে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এসব অবশ্য সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের বক্তব্য; কিন্তু প্রকাশিত গেজেটে বাদপড়াদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করতে দেখা যায়নি।
সরকার বদলায়, প্রশ্নটি থেকে যায় : সরকারি চাকরিতে পুলিশি যাচাই নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়। পুলিশ সংস্কার কমিশনে বলা হয়েছিল, এর শিকড় ব্রিটিশ আমলে; ১৯২৮ সাল থেকে এ ধরনের ভেরিফিকেশনের প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে পুলিশ ভেরিফিকেশনে সাধারণত প্রার্থীর মামলা, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা, গ্রেপ্তার বা দণ্ডিত হওয়ার তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়কে কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, সেটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরিবঞ্চিত হওয়ার ঘটনা নিয়ে বহু অভিযোগ ও পরবর্তী সময়ে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ভেরিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন থামেনি। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। ৪৯তম বিসিএসের গেজেট নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। বাদ পড়া কয়েকজন প্রার্থী তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকার দাবি করেছেন; কারও অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেও তাকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। আবার গোপালগঞ্জের ১১ সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে ৯জন বাদ পড়ার ঘটনায় প্রার্থীরা জেলার পরিচয়কে কারণ বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন সরকারি ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। যদিও বাদ পড়াদের বেশিরভাগই ইতিমধ্যে প্রকাশিত গেজেটে চাকরি পেয়েছেন, কিন্তু তারা কেন বাদ পড়লেন কিংবা পুনরায় চাকরি পেলেন তা তাদের জানা নেই।
অন্যদিকে গত ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিসিএস বা অন্য কোনো সরকারি প্রক্রিয়ায় বৈষম্য করা হবে না। ভেরিফিকেশন নিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়ার অংশ এবং গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ থাকলে যাচাইয়ের পর অল্পসংখ্যক প্রার্থী বাদ পড়তে পারেন।
মামলাও কি চাকরি হারানোর কারণ? : ভেরিফিকেশনের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো মামলা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকা মানেই তিনি অপরাধী আইনের দৃষ্টিতে এমন নয়। অথচ নিয়োগের আগে মামলা, পরিবারের মামলা কিংবা স্থানীয় বিরোধের তথ্য নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হলে চাকরিপ্রার্থীকে ব্যাখ্যার সুযোগ না দিয়েই বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান বলেন, এখানে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় মামলার প্রকৃতি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে মামলা, জমিজমা বা পারিবারিক বিরোধে মামলা, কিংবা তদন্তাধীন মামলার সঙ্গে দণ্ডিত হওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ফলে শুধু ‘মামলা আছে কি না’এই একটি প্রশ্ন দিয়ে একজন প্রার্থীর চরিত্র বা সরকারি চাকরির উপযোগিতা নির্ধারণ করলে নির্দোষ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি মনে করেন, প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে তা যাচাই করা যেতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় বা আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক অবস্থানকে নিয়োগের মানদণ্ড করা উচিত নয়।
জমি নেই, তাই চাকরি নেই : ভেরিফিকেশনের অদ্ভুত দিকগুলোর একটি হলো স্থায়ী ঠিকানা যাচাই। অতীতে নিজস্ব জমি বা বাড়ি না থাকার কারণে চাকরি আটকে যাওয়ার ঘটনাও সংবাদে এসেছে। বরিশালের আসপিয়া ইসলামের পুলিশে চাকরির ক্ষেত্রে ‘ভূমিহীন’ হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল, স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণের সঙ্গে নিজস্ব জমি বা বাড়ি থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েও মিশন আচার্যের নিয়োগপত্র না পাওয়ায় । স্থায়ী বসতভিটা না থাকায় তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অধিকংশ সময় অতি উৎসাহী ও অতিরঞ্জিতভাবে রিপোর্ট দেওয়া হয়। মিশন আচার্যকে বাদ দেওয়াও একই কারণে। চাকরি পেতে হলে স্থায়ী জমি থাকতে হবে আইনের কোথাও এমন নেই, দেশের ১৮ কোটি মানুষের সবার জমি আছে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।