মনিরুল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পেশাগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেন নিজের হিরো মোটরসাইকেল। বছর না ঘুরতেই দেখলেন মাইলেজ কমে যাচ্ছে। বেশি গরম হচ্ছে ইঞ্জিন। তার চেয়ে বেশি সমস্যা বাইক হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। আবার হঠাৎ দেখা যায় স্টার্টই নিচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে একাধিকবার মোটরসাইকেল মেকানিকের শরণাপন্ন হয়েছেন। কার্বুরেটর পরিষ্কার করে ফের কিছুদিন একটু স্বাচ্ছন্দ্যে চললেও একই সমস্যা দেখা দেয় কদিন বাদেই।
শেষমেশ মেকানিকের পরামর্শে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে নতুন কার্বুরেটর লাগান বাইকে। এরপরও অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। মাস তিনেক পর ফের একই সমস্যা দেখা দেয়। তার ভাষ্য, মেকানিকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণেই এ সমস্যা হচ্ছে। তেলে ভেজাল থাকার কারণে কার্বুরেটরে ময়লা জমে যায়। এতে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়।
বিয়ানীবাজার পৌরশহরসহ উপজেলায় অন্তত: ২ শতাধিক পেট্রোল-অকটেনের দোকান রয়েছে। এগুলোর বেশীরভাগ নিবন্ধনহীন। এরমধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশীরভাগ পেট্রোল পাম্পে ভেজাল তেল বিক্রি হয় বলে অভিযোগ আছে। ভেজাল জ্বালানী তেল বিক্রি বন্ধে বিয়ানীবাজারে অন্তত: ৬ বছর থেকে কোন অভিযান পরিচালিত হয়নি। ভোক্তা অধিকার বা বিএসটিআই নিবন্ধনহীন ভেজাল জ্বালানী তেলের দোকান থেকে মাসোহারা নেয় বলে একটি সূত্র জানায়।
Manual7 Ad Code
তবে বিএসটিআই সিলেটের উপ-পরিচালক মাজহারুল হক জানান, পাম্পের তেলের মান নিয়ে আমরা টেস্ট করি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইনসিডেন্ট (ভেজাল) পাওয়া যাচ্ছে। আমরা শোকজ করেছি, তারা জবাব দিয়েছে। তারা ডিপো থেকে তেল কেনে। কিন্তু ডিপো থেকে তো অনেকেই নেয়। তাহলে তার পাম্পের তেল খারাপ হচ্ছে কেন, অন্য পাম্পের তেল তো ভালো পাচ্ছি। খোলা পাম্পগুলো এক্ষেত্রে বেশী দায়ী।
Manual4 Ad Code
তরুণ ব্যবসায়ী মাহমুদ সামি কামাল বলেন, প্রথম অবস্থায় প্রতি লিটার তেলে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পথ যেতে পারতেন। তবে কয়েক বছর পর মাইলেজ কমতে শুরু করে। ৮ কিলোমিটারের বেশি চলে না। এছাড়াও গাড়িতে নানান রকম সমস্যা দেখা দিতে থাকে। তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে ভালোই চলতো। পরে মাইলেজ কমতে শুরু করে। নানান সমস্যা দেখা দেয়। গাড়ির ইঞ্জিন মিসফায়ার হতো। থ্রটল বডি ও ইনজেক্টরে কার্বন জমা হতো। আবার ইঞ্জিন ওভারহিট হতো। তেলে ভেজালের কারণেই এ অবস্থা হয়। পরে গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি।’
বিয়ানীবাজারে এমন শ’ত-শ’ত ভুক্তভোগী আছেন যারা ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণে ভুগছেন। সবাই হয়তো জানেনও না। সংবাদকর্মী ইমাম হাসনাত সাজু বলেন, ‘নতুন বাইকে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। সার্ভিসিং করিয়েছি, তাতেও সমাধান হয়নি। ভেজাল তেল ব্যবহার করায় এ সমস্যা শুরু হয়। মেকানিক তাই বলেছেন।’
মেকানিকের কাছে যেসব গাড়ি মেরামতের জন্য আসে সেগুলোর মধ্যে অনেক গাড়ির একই ধরনের সমস্যা থাকে। ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণেই হয়েছে এমনটি।
বিয়ানীবাজার পৌর শহরের মোটর সাইকেল মেকানিক জয়নুল ইসলাম বলেন, ভেজাল তেলে মূলত পানি, রাসায়নিক দ্রব্য বা সস্তা তেল মেশানো থাকে। এটি ইঞ্জিনের জ্বালানি জ্বালানোর ক্ষমতা কমিয়ে কর্মক্ষমতা হ্রাস করে। ফলে মাইলেজ কমে যায় এবং শক্তি কমে ইঞ্জিন থ্রটল সঠিকভাবে কাজ করে না।
ইঞ্জিনের বেলন, পিস্টন ও স্পার্ক প্লাগে কালো কার্বন বা কালি জমতে থাকে। ভেজাল তেলে ময়লা ও অপরিষ্কার পদার্থ থাকলে ফুয়েল ইনজেক্টর ব্লক হয়ে যেতে পারে। ইনজেক্টরের ক্ষতি হলে জ্বালানি সঠিকভাবে ইঞ্জিনে পৌঁছায় না এবং স্টার্টিং সমস্যা, ধোঁয়া বা ঝোঁক কমে যাওয়া দেখা দিতে পারে।
অপর মোটর সাইকেল মেকানিক দুলাল জানান, ভেজাল তেল ঠিকমতো দহন না হওয়ায় অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়। পানি বা অন্য নোংরা পদার্থ ইঞ্জিনের ধাতব অংশে ক্ষয় ঘটায়। ট্যাংকির ভেতর জং ধরা, পাইপ বা ইঞ্জিনের লুব্রিকেশন সিস্টেমেও ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, ভেজাল তেলের কারণে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স ও স্থায়িত্ব কমে যায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কার্বুরেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ বন্ধ বা স্টার্ট নিতে সমস্যা হয়। মাঝে মধ্যে কার্বুরেটর খুলে পরিষ্কার করলে গাড়ি চলাচলের উপযোগী হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্বুরেটর পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়।