বিয়ানীবাজারে ৫ আগস্টের হত্যা মামলা তদন্তে ’কবর’ই এখন শেষ ভরসা
বিয়ানীবাজারে ৫ আগস্টের হত্যা মামলা তদন্তে ’কবর’ই এখন শেষ ভরসা
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ১২:৫০ অপরাহ্ণ
Manual7 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
Manual2 Ad Code
২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিয়ানীবাজারে নিহতদের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে বিপাকে আছে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলো। ঘটনাবহুল এই দিন পরবর্তী সময়ে বিয়ানীবাজার থানায় মোট ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার দু’টি তদন্ত করছে সিলেটের সিআইডি পুলিশ এবং অপর দু’টি বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ।
জানা যায়, ওইসব মামলায় বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এমপি, নেতাকর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ লোকজনও আসামি হয়েছেন। লাশের ময়নাতদন্ত না থাকায় অভিযোগপত্র দিতেও পারছেন না তদন্তকারী কর্মকর্তারা। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের নজরে আনা হলে নড়েচড়ে বসেছেন তারা, পুলিশ সদর দপ্তরে হয়েছে বিশেষ বৈঠকও। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে নিহতের কবর পাওয়া যাবে, সেটিকেই ময়নাতদন্তের অংশ ধরে মামলার চার্জশিট দিতে হবে।
পুলিশের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত এবং যাদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে, সেসব হত্যা মামলার তদন্তে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী, এসব মামলায় মরদেহের গোসল ও দাফনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ ও স্থান নির্দিষ্ট করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। কবরের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। তারা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকায় এ ধরনের মামলায় প্রাথমিক আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ ও জনপ্রতিনিধিদের সনদের ভিত্তিতে হত্যার ঘটনা ও জড়িতদের শনাক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য এসেছে মানবিক দিক এবং দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হতে পারে। তবে এই ‘সহজ সমাধান’ আদতে বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এতদিন পর লাশ কবর থেকে তুলে এখন ময়নাতদন্ত করা একদিকে যেমন আবেগপ্রবণ পরিবারের জন্য কষ্টদায়ক, তেমনি ফরেনসিক ল্যাবের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আইনের চোখে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ছাড়া একটি হত্যা মামলা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।
Manual6 Ad Code
সিলেট জেলা জজ আদালতের এডভোকেট আবুল কাশেম জানান, খুনের ঘটনা প্রমাণের জন্য প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যসহ প্রাসঙ্গিক সব ধরনের উপাদান প্রয়োজন হয়। আর হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ এবং ছবি ও ফুটেজ সংরক্ষণ জরুরি। পরে নমুনাগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। জুলাইয়ের হত্যা মামলাগুলো ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জরুরি হবে চার্জশিটে। একটি মামলার চার্জশিটে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে ওই মামলা থেকে আসামি খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
Manual4 Ad Code
সিলেট জেলা জজ আদালতের অপর এডভোকেট মো: আমান উদ্দিন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারা অনুযায়ী, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক। যদি কোনো মামলায় এ রিপোর্ট না থাকে, তবে উচ্চ আদালতে শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা একে ‘প্রসিডিউরাল ল্যাপস’ বা পদ্ধতিগত ত্রুটি হিসেবে ব্যবহার করে মামলা খারিজ করার আবেদন করে বসবেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে মামলার স্বার্থে লাশ উত্তোলনের অনুমতি দিচ্ছে আদালত। মৃত্যুর কয়েক মাস পর শরীরের টিস্যু বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পচে যায়। ফলে গুলির ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন আগের মতো স্পষ্ট থাকে না। কেবল হাড়ের আঘাত বা বুলেটের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা নরম কোষের আঘাত প্রমাণ করা এতদিন পর দুষ্কর।
বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও একটি হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছবেদ আলী বলেন, মামলার তদন্ত নিয়ে আমরা এখনো সমস্যায় আছি। বেশিরভাগ লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি। সবকিছু অসম্পূর্ণ। তিনি জানান, বিয়ানীবাজারের ৩ জন নিহতের ঘটনায় শুধূমাত্র ময়নুল ইসলামের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। তাও তার গ্রামের বাড়ি ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ায়। অপর দু’জনের ময়নতদন্ত হয়নি। চার্জশিট দিতে গেলে ময়নাতদন্তে কী আছে তা উল্লেখ করতে হয়।
Manual1 Ad Code
পুলিশ সদরদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম বলেন, জুলাই হত্যা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব মামলার ময়নাতদন্ত নেই, সেখানে নিহতের কবর কোথায় আছে তা চার্জশিটে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। নিরাপরাধ লোকজন যাতে কোনো মামলায় আসামি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। আর মিথ্যা মামলা দিয়ে কেউ বাণিজ্য করলেও তাদেরও আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসছি।