দেশের ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোকে আধুনিক ও সমন্বিত অবকাঠামোর আওতায় আনার লক্ষে যে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটিই এখন প্রশ্নের মুখে। সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ শীর্ষক এই প্রকল্পের শুরুতেই অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রাথমিক পর্যালোচনায় প্রকল্প প্রস্তাবের প্রায় ৩০টি খাতে ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে বলে উঠে এসেছে।
Manual4 Ad Code
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ৬১টি জেলার ১৫০টি উপজেলায় নতুন করে ভূমি অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে। অনুমোদন পেলে আগামী বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী, সমতল এলাকায় পাঁচতলা ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি তলার আয়তন ধরা হয়েছে তিন হাজার ৬৫০ বর্গফুট। হাওর এলাকায় নির্মাণের জন্য রাখা হয়েছে ছয়তলা ভিত্তির ওপর পাঁচতলা ভবনের নকশা। প্রতিটি ভবনের সঙ্গে সীমানা প্রাচীর, ভূমি উন্নয়ন, ড্রেনেজ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ, ফার্নিচার, সাইকেল শেডসহ নানা আনুষঙ্গিক কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কাগজে-কলমে এসব সুবিধা কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধির কথা বললেও ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে।
Manual5 Ad Code
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই ব্যয় বাড়ানোর একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রথম দফায় যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে প্রতিটি উপজেলা ভূমি অফিস ভবনের ব্যয় ধরা ছিল ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু পরে পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) একই ধরনের ভবনের ব্যয় বাড়িয়ে ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন বা নকশাগত সংযোজন ছাড়াই প্রতিটি ভবনের ব্যয় ৪৩ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ১৫০টি ভবনের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এই ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বাস্তবসম্মত কোনো যুক্তি স্পষ্ট নয়।
এছাড়া প্রকল্পে পরামর্শক খাতে প্রায় ১০ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের মানসম্মত নকশা ও নির্মাণ কাজে এলজিইডির বিদ্যমান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে একই ধরনের প্রকল্পে এত বড় অঙ্কের পরামর্শক ব্যয় ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের রাজস্ব ব্যয়ের খাতগুলোতে অস্বাভাবিক অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অংশে অফিস সরঞ্জাম কেনার জন্য যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তা বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। দুটি মোটরসাইকেলের জন্য চার লাখ টাকা, তিনটি এয়ারকুলারের জন্য ছয় লাখ টাকা, দুটি ল্যাপটপের জন্য চার লাখ টাকা এবং দুটি ডেস্কটপের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। একইভাবে কয়েকটি প্রিন্টার, স্ক্যানার ও একটি ফটোকপিয়ারের জন্য যে অঙ্ক দেখানো হয়েছে, সেটিও অতিরিক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতেও ব্যয়ের ছড়াছড়ি দেখা যায়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অংশে প্রচার ও বিজ্ঞাপনের জন্য অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি এলজিইডি অংশেও একই ধরনের খাতে আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে প্রচার ও বিজ্ঞাপনের জন্য এক কোটি ২০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে, যা একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। একইভাবে অনুলিপি, মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে বারবার অর্থ সংস্থান করা হয়েছে।
এলজিইডির অংশে বাড়িভাড়া ভাতা, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ, কুরিয়ার, বিদ্যুৎ বিল, সিল ও স্ট্যাম্প এবং অন্যান্য মনিহারি খাতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব খাতে আনুপাতিক হারে ব্যয় কমানো সম্ভব। বিশেষ করে অনাবাসিক ভবন ভাড়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখার পরও ভবন মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে অতিরিক্ত অর্থ রাখাকে অযৌক্তিক বলে মনে করা হচ্ছে।
যানবাহন ভাড়ার ক্ষেত্রেও প্রকল্প প্রস্তাব প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অংশে প্রকল্প পরিচালক ও উপপ্রকল্প পরিচালকের জন্য আলাদা আলাদা জিপ ভাড়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইভাবে এলজিইডি অংশে নির্বাহী প্রকৌশলী ও সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর জন্য জিপ ও মাইক্রোবাস ভাড়ার ব্যয় দেখানো হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী এসব পদে এমন সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা আছে কিনা, তা যাচাই করার কথা জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
আরও গুরুতর যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো একই ধরনের ব্যয় একাধিক জায়গায় আলাদা করে দেখানো। ভূমি মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অংশে মুদ্রণ, স্টেশনারি, সিল ও স্ট্যাম্প, অনুলিপি এবং অন্যান্য মনিহারি ব্যয় একই নামে ভিন্ন ভিন্ন খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং প্রকৃত ব্যয় কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় এসব খাত ধরে ধরে আলোচনা হবে। যেসব ব্যয় অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত মনে হবে, সেগুলোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। কমিশনের অবস্থান হলো, সরকারি অর্থ যেন কোনোভাবেই অযথা ব্যয় না হয় এবং প্রকল্প অনুমোদনের আগেই ব্যয় কাঠামো বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়।