আগামীর প্রধানমন্ত্রী : বিএনপি জিতলে তারেক রহমান, জামায়াত জোটের কে ?
আগামীর প্রধানমন্ত্রী : বিএনপি জিতলে তারেক রহমান, জামায়াত জোটের কে ?
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
Manual8 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
জাতীয় নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, আগামীর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদটি নিয়ে মানুষের ততই আগ্রহ বাড়ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট বিজয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াত জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে আসনভিত্তিক সমঝোতা, নেতৃত্ব বণ্টন এবং ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে একাধিক বৈঠকে ভবিষ্যতের সরকারপ্রধান নিয়েও একটি প্রাথমিক সমঝোতায় এসেছে। তবে নির্বাচনী মাঠে দৃঢ় ঐক্য ধরে রাখতে এখনও তারা প্রধানমন্ত্রীর পদটির বিষয়ে খোলাসা করছেন না।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারেক রহমান আমাদের যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই নেতৃত্বের অগ্রযাত্রায় সামনে এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রী করে আমরা সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলব।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বরাবরই কোনো একজন শীর্ষ নেতাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দল বা জোটকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১০ দলীয় জোটে এবার সেভাবে কাউকে সামনে রাখা হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এবং দলগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে। এই নির্বাচনে প্রার্থী প্রায় ২ হাজার। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুটি বড় রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে। একদিকে আছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল। অন্যদিকে জামায়াত ও তার সঙ্গে সমঝোতায় আসা দলগুলো।
বিএনপি, গণতন্ত্রমঞ্চ, গণঅধিকার পরিষদসহ যে জোট হয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি এবং এই জোটের নেতৃত্বেও আছেন তারেক রহমান। বিপরীতে জামায়াতসহ ১০ দলের যে জোট হয়েছে, সেখানে একক কোনো নেতৃত্ব নেই। বরং জোটটি চলছে যৌথ নেতৃত্বে। এই জোটে ১০ দলের মধ্যে জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এই পাঁচটি দল ইসলামপন্থি। বাকি পাঁচটি দল হলোÑ জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপি, আমার বাংলাদেশ বা এবি পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। বিভিন্ন ধরনের ১০টি দল একসঙ্গে এলেও কীসের ভিত্তিতে ঐক্য হলো সেটা স্পষ্ট নয়। এই ঐক্যের উদ্দেশ্য কী, আদর্শিক ভিত্তি কী, সেটা নিয়েও কোনো রূপরেখা নেই, বক্তব্য নেই।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতির দল বা জোটগুলো অনেকটা ঐতিহ্যগতভাবেই একজন শীর্ষ নেতাকে সামনে রেখেই ভোটের যুদ্ধে মাঠে নামে। এক সময় আওয়ামী লীগ সামনে রেখেছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। পরে যখন শেখ হাসিনা দলের হাল ধরেন, তখন তার নেতৃত্বেই দল এগিয়েছে। জোট হলে সেই জোটের নেতৃত্বে থেকেছেন শেখ হাসিনা। পরবর্তীকালে বিএনপির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া পর্যন্ত একই চিত্র দেখা গেছে। এমনকি জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও দলটি নির্বাচনের সময় সামনে রেখেছিল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সামনে রেখেছে তারেক রহমানকে।
Manual5 Ad Code
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই জোট নির্বাচনে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন কিংবা নির্বাচনে বিরোধী দলে বসলে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, সেটাও খোলাসা হয়নি। ফলে অস্পষ্ট নেতৃত্ব এবং দলীয় রূপরেখা নিয়ে এই জোট নির্বাচনের মাঠে বিএনপির কতটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে, তা নিয়ে সংশয় আছে অনেকের মধ্যে।
১০ দলের নির্বাচনী ঐক্য গঠনের আগেই অবশ্য এই প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জোট গঠনের আগেই এর সুরাহা করার কথা তোলা হয়। যদিও সেটা নিয়ে পরে আর আলোচনা এগোয়নি। পরবর্তীকালে ইসলামী আন্দোলন অবশ্য আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ঐক্যপ্রক্রিয়া থেকেও বেরিয়ে যায়।
তবে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটে জামায়াতের গুরুত্ব এবং প্রভাব আরও বেড়েছে। দলটি এককভাবে ২১৫টি আসন নেওয়ার পর এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, জোটের মূল শক্তি জামায়াত। ফলে ঘোষণা না হলেও এই জোটে জামায়াতই এখন অঘোষিত নেতৃত্বে, যেটা দলগুলোর বক্তব্যেও পরিষ্কার। তাহলে কি জামায়াতের শীর্ষ নেতাই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীÑ এমন প্রশ্নে জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, শীর্ষ নেতা, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা এসব নিয়ে দলগুলার মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। এখানে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার বা এ ধরনের পদ পেলে সেখানে কে বসবেন, তা নিয়ে আলোচনা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে দলের বেশি সংসদ সদস্য জয়ী হোন, তারাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত একাই লড়ছে ২১৫টি আসনে। এর পরই আছে এনসিপি, দলটির প্রার্থী মাত্র ৩০টি আসনে। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাদের জোটের অন্যদের তুলনায় এগিয়ে আছেন।
জানা গেছে, ১০ দলীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় শেষ সময়ে যুক্ত হয়েছে এনসিপি। নিজ আগ্রহে জোটে যুক্ত হওয়ার পর দলটি নেতৃত্ব কিংবা নির্বাচনে জিতলে কে কোন পদে বসবেন, সেসব নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ পায়নি। আবার এসব ইস্যুতে নিজেদের চাহিদা জানানোর মতো অবস্থাতেও নেই দলটি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জামায়াত দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নির্বাচন করছে। কাজেই এখানে প্রাধান্য বা মুখ্য ভূমিকা তাদেরই। যদি আপনি বিএনপি জোটে বড় দল হিসেবে বিএনপির শীর্ষ নেতাকে ধরেন, তাহলে আমাদের জোটেও বড় দল আছে। সেই দলের নেতাও তো একজনই আছে।
Manual4 Ad Code
জানা গেছে, জামায়াত এখনই জোটের প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। বিশেষ করে জামায়াতের একক নেতৃত্ব বা প্রাধান্য নিয়ে এর আগে ইসলামী আন্দোলনের আপত্তির নজির থাকায় জামায়াত চায় নির্বাচনের পরই এর সুরাহা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন হয়ে গেলে পরে যাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে, তারা কে কতটি আসন পেয়েছে, সেটা দেখা যাবে। তখন সেটার ভিত্তিতেই শীর্ষ নেতারা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দলের পক্ষ থেকে আমরা তো আমাদের শীর্ষ নেতাকেই সামনে রাখব।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনী জোটের প্রক্রিয়া শুরু হয় বছরখানেক আগে, মূলত এই দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার কথা বলে। শুরুতে ইসলামপন্থি পাঁচটি দল জোটের প্রক্রিয়া শুরু করলেও পরে সেখানে ধর্মভিত্তিক নয়Ñ এমন দলগুলোও যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে জানানো হয় ১০ দলের এই নির্বাচনী ঐক্যের কথা যেখানে ইসলামী আন্দোলন যোগ দেয়নি। তবে নির্বাচনী ঐক্য হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে দলগুলো ব্যস্ত থেকেছে মূলত আসন ভাগাভাগি নিয়ে।
ইসলামপন্থি এবং ইসলামপন্থি নয় এ রকম বিভিন্ন দল নিয়ে গঠিত ১০ দলীয় জোটের আদর্শিক ভিত্তির বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, আমাদের ঐক্যের সূচনাটা হয় মূলত ঐকমত্য কমিশন থেকে। সেই সময় এই দলগুলোর বক্তব্য ছিল অনেকটা একই রকম। আমরা সবাই সংস্কার চেয়েছি, বিচার চেয়েছি, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েছি। এই বিষয়গুলোতেই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় থাকা সব দল একমত। কোনো ভেদাভেদ নেই। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে জামায়াত যে ইসলামী রাষ্ট্র করবে, এমনটা তারা কিন্তু বলেনি। কারণ, তারা সেই জায়গা থেকে বের হয়ে সবগুলো দল মিলে কিন্তু গণতান্ত্রিক জায়গায় এসেছে, জোট করেছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকও বলেন, এই জোটের ঐক্যে সূত্র হচ্ছে জুলাই স্পিরিট ধারণ, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান।
Manual2 Ad Code
শাসনের ভিত্তি হিসেবে তিনি বলেন, যার যার আদর্শ, যার যার রাষ্ট্রকল্প, যার যার রাজনৈতিক দর্শন, তার তার কাছে অটুট আছে, অক্ষুণ্ন আছে। আমরা এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে সবার আগে ইনসাফের বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে চাই। আমাদের শরিয়া বা ইসলামী আইনভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন তারা হঠাৎ করে করতে চান না।
Manual2 Ad Code
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এখন তো দেশে বিদ্যমান একটা আইন আছে। যে দলই জিতুক, কালকে গিয়েই তো সেসব আইন বদলাতে পারবে না। তার জন্য একটা প্রসিডিউরের (প্রক্রিয়া) মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সংসদ লাগবে। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, তাদের মধ্যে একটা মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং দরকার হবে। মানুষের জন্য কল্যাণকর, মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন সব বিধান আমরা অ্যালাউ করব। তো এটাতো ইসলামও অ্যালাউ করে।