রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি গ্যাসের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই অচলাবস্থা চলছে। সরকারি উদ্যোগ, আশ্বাস আর নজরদারির কথা শোনা গেলেও বাস্তবে দোকান ও গোডাউনে খালি সিলিন্ডার রিফিল হচ্ছে না। এতে দুর্বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নীতিনির্ধারকরা রোজার আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগে সংকট কাটার সম্ভাবনা কম।
Manual7 Ad Code
গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এলপি গ্যাসের বাজারে চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য। সরকার ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই দামে গ্যাস পাওয়া তো দূরের কথা, অনেক এলাকায় দ্বিগুণ দাম দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের মতো করে দাম হাঁকাচ্ছেন।
Manual8 Ad Code
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্রে জানা যায়, মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি বিক্রি হয়, দৈনিক গড়ে ৫ হাজার টন। এই ৫ হাজার টন গ্যাস ৪ লাখ ১৫ হাজার সিলিন্ডারে ধরে। সেই হিসেবে সিলিন্ডারপ্রতি গড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা অতিরিক্ত আদায়ের ফলে দিনে গ্রাহকের পকেট থেকে চলে যাচ্ছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। মাসের হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এলপিজির বর্তমান সংকট সম্পূর্ণ কৃত্রিম। এর নেপথ্যে আমদানিকারকরাই মূল ভূমিকা রাখছেন।
তিনি বলেন, ১ হাজার ৩০০ টাকার জিনিস আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হচ্ছে। এত বড় লাভ কেউ ছাড়বে না।
বিইআরসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এই সংকটে বিইআরসির ভূমিকা একেবারেই রহস্যজনক। তারা মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও লোয়াব যদি আন্তরিক হতো, তা হলে এই সংকট এতটা বাড়ত না। এলপিজির ওপর একক নির্ভরশীলতাই এই সংকটকে ভয়াবহ করেছে বলে মনে করেন নাজের হোসাইন।
তিনি বলেন, যাদের বিকল্প নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ইলেকট্রিক চুলা বা অন্য কোনো বিকল্প থাকলে এই সংকটের প্রভাব কম হতো। তিনি জানান, ইতিমধ্যে অনেক গ্রাহক এলপিজি ছেড়ে ইলেকট্রিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন, যা ভবিষ্যতে বাজারের চিত্র বদলে দিতে পারে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল জব্বার বলেন, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে সংকটের কারণেই দেশে এলপিজি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ এলপিজি আসে স্পট মার্কেট থেকে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও কাটেনি।
Manual4 Ad Code
তিনি দাবি করেন, অপারেটররা এলপিজি বিক্রির সময় বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নিচ্ছেন না। তবে বিতরণ ও খুচরা পর্যায়ে অনিয়ম বেশি হচ্ছে।
বিইআরসির সদস্য মো. মিজানুর রহমান বলেন, এলপিজি আমদানি বাড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান বলেছেন, রোজার আগেই ইনশাআল্লাহ এই সংকট কেটে যাবে। জানুয়ারি ও পরবর্তী মাসগুলোতে যে পরিমাণ এলপিজি আসার প্রক্ষেপণ রয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক।
তিনি জানান, জানুয়ারিতে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এবং পরবর্তী মাসগুলোতে আরও বেশি এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে রাজধানীতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের চাহিদা আরও বেড়ে গেছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে শুরু হয়েছে এই সংকট। খুচরা দোকানিরা বলছেন, এলপিজি গ্যাস সংকট নিয়ে কথা না বলতে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে তাদের ওপরে চাপ রয়েছে। ফলে এ নিয়ে তারা কথা বলতে পারছেন না। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও খিলগাঁওসহ একাধিক এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ খুচরা দোকানেই বিভিন্ন কোম্পানির খালি এলপিজি সিলিন্ডার জমে আছে।
মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারে কামাল আহমেদ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, পুরো ব্যাপারটা ওয়ান-টু-থ্রি সিন্ডিকেটের মতো চলছে। ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতারা মিলে এটা করছে। আপনি এমনিতে সিলিন্ডার চাইলে বলবে নেই। কিন্তু যদি বলেন, যত লাগে দিমু। দেখবেন ঠিকই পেয়ে যাবেন।
শেরশাহসুরি রোডের প্রগতি হার্ডওয়ারে কাজ করা মো. ইমন বলেন, আমাদের কাছে কোনো সিলিন্ডার নেই। গত ১০-১২ দিন আগে কয়েকটা পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন নেই। পাশের ইয়াছিন জেনারেল স্টোরের জাকির হোসেন বলেন, এক মাস ধরে গ্যাস পাই না। ডিস্ট্রিবিউটররা বলছে গ্যাস নেই। পেট্রোম্যাক্স মাঝেমধ্যে দুয়েকটা দেয়। বাকিরা তাও দেয় না।
এ সময় ইয়াছিন জেনারেল স্টোরের সামনে সোহরাব নামে একজন সিলিন্ডারের জন্য আসেন। কিন্তু সিলিন্ডার না পেয়ে বেশ হতাশ দেখা যায় তাকে। স্থানীয় নিউ কলোনির এই বাসিন্দা বলেন, আমার গ্যাস শেষ হয়েছে। এখন গ্যাস না পেলে হোটেল থেকে খাবার কিনতে হবে। একেবারেই না পাওয়া গেলে কেরোসিনের চুলা কিনতে হবে। গরিবের ভোগান্তি দেখার কেউ নেই।
Manual4 Ad Code
বাসাবোর খুচরা বিক্রেতা নাদিম আহমেদ বলেন, গ্যাস অল্প কিছু পাইছিলাম। ওগুলো শেষ হয়ে গেছে। ঈদের আগে এই সংকট কাটবে না।
মাদারটেকের বাসিন্দা বেনজির শুভ জানান, সকালে গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর এলাকায় কোথাও সিলিন্ডার পাননি। পরে রামপুরা বাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।