ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারের ডামাডোলে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে সারা দেশে। তবে উৎসবের সঙ্গে বিরাজ করছে আতঙ্কও। বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠিত অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। সীমান্ত পার হয়েও অস্ত্র প্রবেশ করছে। দেশেও তৈরি হচ্ছে অস্ত্র। সেই সঙ্গে জেল পলাতক ৭ শতাধিক বন্দিরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে নির্বাচনে এসব অবৈধ অস্ত্র ও পলাতক বন্দি ব্যবহৃত হতে পারে। দেশ-বিদেশে পলাতক আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরাও প্রভাব ফেলতে পারে। সে সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও নির্বাচনে সহিংসতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রার্থীরাও তাগাদা দিচ্ছেন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে। প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকেও বলা হয়েছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে। সব মহল থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলা হলেও কার্যত কোনো সুসংবাদ নেই এ বিষয়ে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য ঘোষিত পুরস্কারও কোনো কাজে আসছে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এক হাজার ৩৩৬টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করার পরও তা উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রও নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার অবৈধ অস্ত্র কেন উদ্ধার করা যাচ্ছে না সেই বিষয়েও কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। যদিও সম্প্রতি রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীরা নদীতে ফেলে দেওয়ায় সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন, এসব অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহার হবে না।
নির্বাচনে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু তারপরও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নেই সফলতা।
Manual3 Ad Code
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের আগে যত দ্রুত সম্ভব লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করার তাগিদ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। গত মঙ্গলবার দুপুরে ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে এক বিফ্রিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
গত সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভাতে অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। সভা সূত্রে জানা যায়, সভায় জানানো হয়, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৪৬টি। এসব অস্ত্র কেন উদ্ধার হচ্ছে না সে বিষয়েও সদুত্তর দিতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম শনিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সামনে নির্বাচন। এই মুহূর্তে দেশ অস্থিতিশীল করার জন্য অনেকে তৎপর আছে। এই মাসে আমরা সর্বাধিক প্রায় ১৩টির মতো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছি।
অন্যদিকে নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র কেনা ও মজুদ নিয়ে আলোচনার একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে বজলুর রহমান ওরফে ‘ডন বজলু’ নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে আসে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, ডন বজলু তার লোকজন নিয়ে সোনারগাঁয়ের একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় ডন বজলুর পাশে বসা তার একান্ত সচিব হিসেবে পরিচিত জাকারিয়াকে ডনকে বজলুর কানে বলতে শোনা যায়, নির্বাচনের জন্য আমাদের আরও দুটি অস্ত্র দরকার। কথোপকথনে অবৈধ অস্ত্র মজুদের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
Manual6 Ad Code
এ ঘটনার পর গত শনিবার র্যাব-১১-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ডন বজলুকে তার সহযোগী ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে প্রকাশ্যে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি, যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হচ্ছে দেশি অস্ত্র। নির্বাচনের আগে এই তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির একটি অবৈধ কারখানার সন্ধান পায় যৌথবাহিনী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার কার্যক্রম শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার থেকে। প্রচারের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, পাবনার চাটমোহর, মাগুরা ও ধামরাইসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষ হয়। সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের ঘটনা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরকম প্রেক্ষাপটে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন প্রার্থীরা।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক সংসদ সদস্য ও কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াত মনোনীত ও ১০ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গত শুক্রবার কক্সবাজার জেলা জামায়াত কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে গত বুধবার ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে ফুটবল প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকার বলেন, অবৈধ অস্ত্র ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে উৎসবমুখর ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
আগ্নেয়াস্ত্র থানায় জমার নির্দেশ : ৩১ জানুয়ারির মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিকটস্থ থানায় জমা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সম্প্রতি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ের আগ্নেয়াস্ত্র শাখা থেকে জারি করা জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ নিকটস্থ থানায় বা বৈধ ডিলারের কাছে লাইসেন্সধারী নিজে অথবা মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে।
এই আদেশ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দি আরমস অ্যাক্ট, ১৮৭৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারার বিধান অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Manual1 Ad Code
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৮০ ভাগই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যদিও ১ হাজার ৩০টির মতো অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। বর্তমানে দেশব্যাপী ডেভিল হান্ট অভিযান চলছে। গত বুধবার থেকে অভিযানে আরও বেশি সদস্য যোগ হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নির্বাচনের আগে লুট হওয়াসহ যেকোনো ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা। পাশাপাশি জেল পলাতক আসামিসহ চিহ্নিত এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেফতার করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও আগাম তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
অন্যদিকে, সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে-পরে বিভিন্ন কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪০ বন্দি পালিয়ে যায়। এ সময় কারাগার থেকে ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল লুট হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে এখনও ২৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আসামিদের মধ্যে এখনও ৭০০ জন পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ধরা না পড়া বন্দিদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও ৯ জন জঙ্গি।