প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

একাত্তর-ধর্ম-ভারত-চাঁদাবাজি : পুরোনো অস্ত্রেই লড়াই

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
একাত্তর-ধর্ম-ভারত-চাঁদাবাজি : পুরোনো অস্ত্রেই লড়াই

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual4 Ad Code

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের মাঠে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। প্রচারের শুরু থেকেই দুই দলের পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক বক্তব্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নির্বাচনি রাজনীতি। বিএনপি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা ও ধর্মকে ভোটের হাতিয়ার করার অভিযোগ তুলছে আর জামায়াত পাল্টা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও ভারতের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে বিএনপিকে কোণঠাসা করতে চাইছে। পুরোনো এসব ইস্যু ঘিরে আনুষ্ঠানিক প্রচারের প্রথম দিন থেকেই নতুন করে শুরু হয়েছে এই বাকযুদ্ধ। ফলে ভোটের মাঠকে একদিকে যেমন সরগরম করছে, তেমনি সংঘাতের আশঙ্কাও উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়েছে। প্রচারের আগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের মধ্যে কিছুটা বাকযুদ্ধ চলছিল কিন্তু তা আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি। প্রচার শুরুর পর থেকে বাকযুদ্ধের রূপ ও মুখ বদলেছে। পরোক্ষভাবে অন্য পক্ষের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলেছেন বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিশ্লেষণের জায়গা করে চায়ের আড্ডা, সামাজিকমাধ্যম থেকে সব মহলে। অথচ এর আগে দুই দলের নেতারা বলেছিলেন, তারা আর দোষারোপের রাজনীতিতে ফিরবেন না। যদিও বিএনপির মতে, নির্বাচন মানেই কথা, কথার লড়াই ও পাল্টা আক্রমণ। এটাই নির্বাচনের সৌন্দর্য। তারা শুধু প্রতিপক্ষের আগের ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর জামায়াত বলছে, তারা দোষারোপের রাজনীতি করছে না। বিএনপির বক্তব্যের জবাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করছে। প্রচারের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে সমাবেশ করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রথম দিনেই তিনি সিলেটের একাধিক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেন এবং বক্তব্যে তিনি সরাসরি না হলেও জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। দলটির বিরুদ্ধে তিনি ‘মিথ্যাচার’ করা, মানুষকে ‘ঠকানো’ ও ‘শিরক’ করার অভিযোগ এনেছেন। এমনকি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকাও টেনে আনেন তারেক রহমান। মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এনআইডি কার্ড ও মোবাইল নম্বর নিয়ে নারীদের ‘একটি দল বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করছে’ বলে অভিযোগ করেন বিএনপি শীর্ষ নেতা তারেক রহমান।

তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেব, ওই দেব বলছে, টিকেট দেব বলছে… বেহেশতের মালিক আল্লাহ…যেটার মালিক মানুষ না, সেটার (দেওয়ার) কথা যদি সে বলে, তা হলে তো শিরক হচ্ছে, সবকিছুর ওপরে আল্লাহর অধিকার। কাজেই তারা আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তা হলে কেমন ঠকান ঠকাবে বোঝেন এবার।

Manual1 Ad Code

 

সিলেট থেকে সড়কপথে হবিগঞ্জে আসার আগে মৌলভীবাজারের নির্বাচনি সমাবেশে তিনি বলেছেন, আরে ভাই, আপনাদের তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে; ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান সরাসরি জামায়াত ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে বলেন, দিল্লি নয়, পিন্ডিও নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, কেউ দিল্লিতে পালায়, কেউ পিন্ডিতে পালায় কিন্তু বিএনপি দেশের মানুষের পাশেই থাকে।

 

এর জবাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত নেতাকর্মীরা জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে দেশেই ছিলেন। দেশ থেকে কোথাও মুচলেকা দিয়ে পালিয়ে যাননি। যে দলের নেতারা দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় না। এ ছাড়া চাঁদাবাজির প্রতি ইঙ্গিত করে দিয়েছেন একাধিক বক্তব্য। প্রায় প্রত্যেক সমাবেশে একটি দল দেশে টানা চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে জামায়াত থেকে।

Manual4 Ad Code

 

বক্তৃতায় তারেক রহমান উন্নয়নের অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন, বেকারদের প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিটি জনসভায় উপস্থিত জনতার সমর্থন চেয়েছেন। বিপরীতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতিকে ‘খয়রাতি’ অনুদান বলে কটাক্ষ করেন এবং এটি চাঁদাবাজি ও লুটপাটের উৎস হতে পারে বলে বৃহস্পতিবার মিরপুরের জনসভায় ইঙ্গিত দেন। এ প্রসঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দুই হাজার টাকার অনুদানের উল্লেখ করে জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেন, তাদের হাতে খয়রাতি কোনো অনুদান আমরা তুলে দিয়ে তাদের অপমান করতে চাই না।

 

গত শুক্রবার এই বাক‌যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। খুলনায় নির্বাচনি সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনকে আখ্যা দেন ‘দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ’ হিসেবে। তিনি বলেন, আগে যুদ্ধ হতো তরবারি, তীর-ধনুক ও কামান দিয়ে। এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালট দিয়ে। তারেক রহমানের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো মুসলমান আরেক মুসলমানকে কাফের বলতে পারেন না। তিনি এটা বড় অপরাধ করেছেন। তিনি আরও বলেন, উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের।

 

বিএনপি চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমিরের গত দুদিনের নির্বাচনি জনসভার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ধরা পড়ে। সেটি হলো, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রশ্নে। জামায়াতের আমির ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রসঙ্গে বলেন, যারা গত ৫৪ বছরের পচে যাওয়া রাজনীতি চান না, রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন চান, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন বলে আশা করছেন। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

 

বিএনপিকে ইঙ্গিত করে কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, একটি দল ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় আসতে চায়। তারা ভারতের সঙ্গে আপস করে দেশ শাসনের জন্য বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দিতে চায়। তবে তাদের সেই স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। এ দেশের মানুষ আর চার কোটি যুবক এটা কখনোই হতে দেবে না।

 

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমিরের অভিযোগ ‘রাজনৈতিক অপপ্রচার’ হিসেবে দেখছে বিএনপি। গত শনিবার গুলশানে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহাদী আমীন বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের খুব প্রভাবশালী একজন নেতা ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে যে দাবিটি করেছেন, তিনি একটি মিডিয়ার কথা বলেছেন স্বাভাবিকভাবেই তার স্বপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেনও না।

 

নতুন বাংলাদেশ ভোটের মাঠে দোষারোপের রাজনীতিতে ফিরে আসছে কি না? জবাবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সময়ের আলোকে বলেন, আমি বুঝতে পারছি না আপনারা কেন এভাবে বলার চেষ্টা করছেন। নির্বাচন মানেই কথা, কথার লড়াই, কথা দিয়ে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ। এটাই তো বিউটি অব ইলেকশন (নির্বাচনের সৌন্দর্য)। নির্বাচনের মাঠ তো কোনো পুষ্পশয্যা নয়। এখানে কথার লড়াই চলতেই থাকবে।

 

এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমেরিকার ‘গোপন আঁতাত’ হয়েছে বলে ফরহাদ মজহার যে দাবি করেছেন, সেটিও ওঠে এসেছে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে তিনি বলেন, এই আঁতাত বাংলাদেশের জন্য মোটেও ভালো নয়। এ বিষয়ে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জরুরি ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন মির্জা ফখরুল। গত শনিবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্বাচনি গণসংযোগকালে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন পোস্টের খবরটি কতটুকু সত্য এবং এর নেপথ্য ব্যাখ্যা কী, তা জনগণের সামনে আসা প্রয়োজন।

 

আক্রমণাত্মক বক্তব্য ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না? জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ভোটে আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কিছুই প্রভাব পড়বে না বরং মাঠে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ ইনবিসিবল (অনুপস্থিত) থাকায় মজা পাচ্ছি না।

 

Manual8 Ad Code

এ প্রসঙ্গে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমরা কাউকে দোষারোপ করছি না। শুধু একাত্তরের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছি। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে একাত্তরের কথা বলবেই। তারা (জামায়াত) যেভাবে প্রচার চালাচ্ছে, তা খুবই ভ্রান্ত চিন্তা। জামায়াতকে নতুন করে চেনার কিছু নেই। তারা প্রত্যেক সরকারের সঙ্গে ছিল। ১৯৭১-এর আগে ও পরে মানুষ জামায়াতের চরিত্র দেখেছে।

 

অন্যদিকে, জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা দোষারোপের রাজনীতি করছি না। আমাদের সম্পর্কে একটা দল নানা কথাবার্তা বলছে। এমনকি শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে। তাদের কথায় মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। সে জন্য আমাদের অবস্থানটা পরিষ্কার করছি।

 

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, প্রচারের শুরু থেকেই দুই দলের পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক বক্তব্য নির্বাচনি রাজনীতিকে ক্রমেই সংঘাতমুখী করে তুলতে পারে। এ ধরনের ভাষা ও আচরণ মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা, অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসা ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এর ফল হিসেবে সংঘর্ষ, সহিংসতা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে যা অতীতে বাংলাদেশের নির্বাচনি অভিজ্ঞতায় পরিচিত। ভোটারদের বড় একটি অংশ এতে ভীত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে, ফলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কমতে পারে। সার্বিকভাবে এটি একটি নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের জন্য নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর বলেন, দুই জোট একে অন্যের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিলেও তাদের মূল আলোচনা-সমালোচনা নির্বাচনি ইশতেহার ও পলিসিকেন্দ্রিক। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে আক্রমণাত্মক বক্তব্যের প্রবণতাও কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ বর্তমান প্রজন্মের কাছে এ বিষয়টি বিরক্তিকর এবং অপছন্দের।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code