দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, অনিশ্চয়তা ও নানা শঙ্কা পেরিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকারের নিরাপত্তা প্রস্তুতি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। পুলিশ, স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ) বা বিলুপ্ত র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্য ইতোমধ্যে দেশজুড়ে মাঠে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।
সেনা সদর বলছে, ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য ঝুঁকি, সহিংসতা ও নাশকতার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে আগাম থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটারদের নির্বিঘ্ন উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনি সরঞ্জাম সুরক্ষা এবং যেকোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।
মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি
নির্বাচন ঘিরে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে সাড়া দিতে প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোট কেন্দ্রের পাহারায় সেনাবাহিনীর ৫৪৪টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ক্যাম্প থেকে ২৪ ঘণ্টা টহল, মোবাইল পেট্রোলিং ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম পরিচালিত হচ্ছে। সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, যেকোনও তথ্য বা অভিযোগ পেলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ‘রেসপন্স টাইম’ কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্যসহ সবগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ৮ লাখ সদস্য ভোটের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে।
প্রয়োজনে সামরিক হেলিকপ্টার ও নৌযানের মাধ্যমে কর্মকর্তা ও নির্বাচনি সরঞ্জাম পরিবহন করা হবে। দুর্গম কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগুলো আগাম মোতায়েন রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। ভেতরে ও বাইরে পুলিশ ও আনসার দায়িত্ব পালন করবে। বৃহত্তর এলাকা ছাড়াও এবারের ভোটে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল থাকবে ভোটকেন্দ্রের আঙ্গিনা পর্যন্ত। এতে কেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে উভয় জায়গায় সমন্বিত কড়া নজরদারি থাকবে। বিশেষ করে ব্যালট বাক্স পরিবহন, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হবে।
Manual1 Ad Code
চেকপোস্ট ও নজরদারি
গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মহাসড়ক, প্রবেশপথ ও স্পর্শকাতর এলাকায় এরই মধ্যে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। যানবাহন তল্লাশি, সন্দেহভাজন চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ অস্ত্র বা বিস্ফোরক পরিবহন ঠেকাতে এসব চেকপোস্ট কাজ শুরু করেছে।
রাতের বেলায় টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি বা সংঘর্ষের খবর পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স। এ দলগুলো দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম।
বাড়তি সতর্কতা
Manual1 Ad Code
অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা তথ্য ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য ‘হটস্পট’ এলাকা চিহ্নিত করে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। হটস্পট এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, নিবিড় টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সহিংসতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে আগে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচনের সময় শ্রমিক অসন্তোষ, নাশকতা বা কৌশলগত স্থাপনায় যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগ অবকাঠামো ও সরকারি স্থাপনাগুলোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
সেনাবাহিনীর সব আইটি সিস্টেম, নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল অবকাঠামো যাতে কোনও ধরনের সাইবার আক্রমণের শিকার না হয়, সে জন্য আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী তার দায়িত্বপূর্ণ সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সুরক্ষিত রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে।
Manual1 Ad Code
সেনা সদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মো. মনজুর হোসেন বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আগে থেকেই পূর্ণাঙ্গ থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছি। সেনাবাহিনীর যেকোনও মোতায়েন বা অপারেশনের আগে এটি আমাদের প্রাথমিক কাজ। সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই কোথায় কত সদস্য মোতায়েন হবে, কোথায় টহল জোরদার করতে হবে এবং কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে— সব কিছু পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনের আগে ও পরে সম্ভাব্য যেকোনও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত আছি। প্রয়োজনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম রাখা হয়েছে।’’