এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জয় সহজ হতে পারে, প্রথম দিকে এমন একটি ধারণা ছিল। কিন্তু যত দিন গড়াচ্ছে, নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে দলটির সামনে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেই তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে এই দুই দলেই বাড়ছে অস্থিরতা-উত্তেজনা। নির্বাচনি প্রচারে দল দুটির শীর্ষ নেতৃত্বের কথায়ও প্রকাশ পাচ্ছে সেই অস্থিরতা। রাজনীতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন মেরূকরণ। নির্বাচনের আর বাকি দুই দিন। উভয় দলেরই রয়েছে নানা ঝুঁকি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দুই দলের পাঁচটি করে ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরা হলো–
বিদ্রোহী প্রার্থী অভ্যন্তরীণ কোন্দল
দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর দুই দিন বাকি থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় থাকা নেতাদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি করাতে পারেনি বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছেন, এমন অন্তত ৭১ জনকে বহিষ্কার করেও নির্বাচনি লড়াই থেকে বিরত রাখা যায়নি। বরং এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী বেশ কয়েকটি আসনে দলের মনোনীত প্রার্থীদের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন বলে দলের ভেতরেই আলোচনা আছে। কোনো কোনো এলাকায় দলের একাধিক বহিষ্কৃত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। ভিন্ন দলের যেসব নেতাকে বিএনপি দলীয়ভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাদেরও অনেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে। বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের কেউ কেউ এসব নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
আবার মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অনেকেই দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান না নেওয়ার ঘটনায়ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও দলের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে তাদের কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে এসে দলের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় হতে শুরু করেছেন।
জানা গেছে, গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, এমন অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন তাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, যা দলীয় প্রার্থীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আবার দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শ নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় যাদের বিএনপি বহিষ্কার করেছে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতা-কর্মীদের অনেকেই এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এতে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিয়েছে। তবে সেসব কোন্দল বড় আকারে প্রকাশ পাচ্ছে না।
সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিতে ভাবমূর্তি সংকট
Manual7 Ad Code
২০ বছর আগেও সারা দেশে আলোচনা ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সন্ত্রাস বাড়ে আর বিএনপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি বাড়ে। এরপর আওয়ামী লীগের প্রায় ১৭ বছরের সরকারের সময়ে সন্ত্রাস-দুর্নীতি এমনভাবে বেড়েছিল যে অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। ফলে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর দুর্নীতির ট্যাগ মুছে যায়। তবে এই সময়ে বিএনপির ওপর নতুন ট্যাগ বসেছে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির। গত প্রায় দেড় বছরে গণমাধ্যমগুলোতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অবৈধ দখল-চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিভিন্ন খবর উঠে এসেছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম এক নির্বাচনি জনসভায় তার নেতা-কর্মীদের অনুরোধ জানিয়ে দুই হাত জোড় করে বলেন, ‘১২ তারিখ (১২ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত আপনারা চাঁদাবাজি করবেন না।’ একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দেন, ‘বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
বিএনপির দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখলসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৩ হাজার ২০০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী ১ হাজার ৮০০ জন। শাস্তি হিসেবে ৮০০ জনকে বহিষ্কার, ৫০ জনের পদ স্থগিত, কমপক্ষে ৭০০ জনকে কারণ দর্শাও নোটিশ, ১০০ জনকে সতর্ক এবং ১৫০ জনকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে নোটিশ দেওয়া হয়। একই ধরনের অভিযোগে ছাত্রদলের প্রায় ৪০০ জনকে বহিষ্কার ও কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছে অন্তত ৬০০ নেতা-কর্মীকে। স্বেচ্ছাসেবক দলের শতাধিক নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার ও অন্তত ১৫০ জনকে কারণ দর্শাও নোটিশ এবং যুবদলের শতাধিক নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
Manual3 Ad Code
এদিকে নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতা-কর্মীরা বিএনপির বিরুদ্ধে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে নির্বাচনি জনসভায় বিএনপির সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির কথা তুলে ধরছেন। নির্বাচনের আগে এই ভাবমূর্তি থেকে বিএনপির উত্তরণ সহজ হচ্ছে না বলেই মনে করছেন অনেকেই।
বিএনপির নতুন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-এনসিপি
আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপিকেই এখন সবচেয়ে বড় দল হিসেবে মানা হয়। আওয়ামী লীগ না থাকায় দেশে দ্বিদলীয় ব্যবস্থাও (টু পার্টি সিস্টেম) এখন অনুপস্থিত। তবে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তো আর চলে যাননি। ওই ভোটাররা কোন দিকে টার্ন করেন, তারা সংঘবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কি না, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে এটা স্পস্ট যে দৃশ্যপটে আওয়ামী লীগ না থাকায় নির্বাচনে দ্বিদলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে দুই ধারায় রূপান্তর হতে যাচ্ছে। একদিকে একটু লিবারেল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, যার নেতৃত্বে থাকছে বিএনপি। সঙ্গে থাকছে কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক অংশ। অন্যদিকে থাকছে রক্ষণশীল ও ইসলামি ধর্মীয় ধারা। সেখানে থাকছে জামায়াত, এনসিপিসহ ইসলামি ধারার কয়েকটি দল। ফলে বিএনপিকে এখন শক্তভাবে চ্যালেঞ্জ করার মতো রাজনৈতিক দলের মধ্যে রয়েছে জামায়াত-এনসিপিসহ কয়েকটি ইসলামি দল।
বড় ফ্যাক্টর নতুন প্রজন্ম ও নতুন ভোটার
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। জয়-পরাজয়ে তাদের ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টি তরুণদের ভোটের দিকে। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) আছে ভোটের মাঠে। অবশ্য তারা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে শরিক হয়েছে।
দেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। রাজনীতির নতুন বিন্যাসে তরুণদের ভোট কোনদিকে যাবে, সেটা আগে থেকেই ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে এই বিপুলসংখ্যক ভোট নিজেদের বাক্সে ফেলতে নানা কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে দলগুলো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। একই সঙ্গে তারা দ্রুত মত বদলাতে সক্ষম এবং সামাজিক প্রভাবের দিক থেকেও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে। তাই এই তরুণরা কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাও আগেভাগে বলা মুশকিল। তাদের মন বোঝা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সহজ হবে না। মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র বা ইতিহাসের ভূমিকা অস্বীকার না করলেও তরুণদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আগামীতে তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে। কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে, শিক্ষা কতটা কর্মমুখী হবে, দক্ষতা কীভাবে বাড়বে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক হবে, মতপ্রকাশ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পরিবেশ, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান- এই বিষয়গুলো তরুণদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিবেচনায় বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপি তরুণদের ভোট কতটা নিজেদের পক্ষে আনতে পারে তার ভোটের ফলাফল থেকেই জানা যাবে।