দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। আর ভোটারের অনুপাতে সেই হার ৪৯.২৬ শতাংশ। ভোটারের সংখ্যা যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। জিডিপিতে এখন প্রায় ২০ শতাংশ সরাসরি অবদান রয়েছে নারীদের। কৃষি, রপ্তানি শিল্প, প্রবাসী আয়, তৈরি পোশাকশিল্পসহ সবক্ষেত্রে নারীর অবদান বাড়তে থাকলেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, নির্বাচনে দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। নারীদের নিয়ে এবার যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছে, তাতেও অসন্তুষ্ট তারা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘একেবারে গোড়ায় গলদ। নারীকে মানুষ হিসেবে তার মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নারী তো শুধু ভোটার নন। নারীর মানবাধিকারকে রাজনৈতিক দলগুলো এড়িয়ে গেছে। ক্ষমতায়নে রাজনৈতিক দলগুলো নারীর ক্ষমতায়নে অনীহা প্রকাশ তাদের দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করেছে। এসব অনীহা নারীরা গ্রহণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যূনতম দাবি ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা। সেটি মানা হয়নি, বাম দলগুলো ছাড়া কেউ প্রার্থিতায় নারীদের প্রতি সম্মান দেখায়নি। তারা পেশিশক্তিকে মূল্যায়ন করেছে। পাওয়ার অ্যান্ড মানি পলিসিতে তারা নারীকে অবমূল্যায়ন করেছে।’
Manual8 Ad Code
তার ভাষায়, ‘নারীরা শুধু ভোটার নন, তারা সমাজের প্রতিটি স্তরে অবদান রাখছেন। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের অংশগ্রহণকে প্রান্তিকভাবে দেখছে। কৃষি, শিল্প, গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও শুধু সংসদের প্রতিনিধিত্বে নারীর অংশহগ্রহণ ক্রমেই কমছে। শুধু ভাতার ব্যবস্থা হলেই তো ক্ষমতায়ন হয় না। আর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে তার নাগরিক অধিকারও নিশ্চিত নয়।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ (২৩.৭ মিলিয়ন)।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, প্রতিদিন ভোটের প্রচারে অংশ নিচ্ছেন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধান ব্যক্তিরা। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু, শেখ হাসিনার দেশ থেকে পলায়নের পর কোনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বেই আর নারী নেই। বিএনপি এত বড় দল, তারপরও ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেয়নি, যা কাম্য ছিল না। অন্যদিকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরায় দেওয়া জামায়াতে ইসলামের আমিরের বক্তব্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি জামায়াত আমিরের টুইটার পোস্ট নিয়েও চলছে অসন্তোষ।
Manual5 Ad Code
মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর বলেন, ‘৫ শতাংশ প্রার্থী না দেওয়ায় দলগুলোর দেউলিয়াপনার প্রমাণ হয়েছে। তারা নারীকে শুধু অধিকারবঞ্চিত করেনি বরং অপমান করেছে। নারীদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও আচরণ তাদের রাজনৈতিক চরিত্র প্রকাশ করেছে। নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা, ধর্মকে ব্যবহার এসবই ভন্ডামি। ধর্মে নারীকে এমন অসম্মানিত করা হয়নি। এরা ধর্মেরও ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।’
Manual7 Ad Code
একটি দলের প্রধানের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার ও নারীর প্রতি দলীয় অবস্থান নিয়ে খুশি কবীর বলেন, ‘এটা গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রামীণ সহজ-সরল নারীরা হয়তো বুঝতে পারছে না, তবে কর্মজীবী ও শিক্ষিত নারীরা এটি ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এটি নারীদের প্রতি চরম অবমাননা।’
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দল এনসিপিও নারীদের মূল্যায়ন করতে পারেনি। দলগুলোর এমন অবস্থা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘খুব অল্প করে বলতে পারি, এ নির্বাচন নারীকে শুধুই অবজেক্ট হিসেবে স্পেসিফাই করল। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কোনো একটি দলও সুনির্দিষ্ট আলোচনায় এগিয়ে আসেনি। এ নির্বাচনী আয়োজনে নারীকে তার অধিকারের জায়গায় আরও পিছিয়ে নিয়ে গেল, যা কাম্য ছিল না।’
গণমাধ্যমের বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসল ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন দেশের কোটি কোটি নারী ভোটার। ভোটের পুরো সমীকরণই বদলে যেতে পারে এ নারী ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে। ফলে আগামী সরকার কারা গঠন করবে, তা নির্ভর করছে এই নারী ভোটারদের ওপরই। প্রার্থী তালিকায় এবার নারীদের উপস্থিতি হতাশাজনক হলেও ভোটার হিসেবে নারীর গুরুত্ব অতীতের যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন। বিপরীতে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৫০ শতাংশ (৪৯ দশমিক ২৬ শতাংশ)। অর্থাৎ, নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের কাছাকাছি। এরই মধ্যে নারী ভোটারদের টানতে বিএনপি ৫০ লাখ পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান ও নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়াসহ প্রতি জেলায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে। জামায়াতে ইসলামীরও দেশ জুড়ে থাকা ১৫ লাখ নারী কর্মী শহর ও গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন। আবার এনসিপিও শিক্ষিত ও নতুন প্রজন্মের নারী ভোটারদের জন্য ডিজিটাল এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে।
নির্বাচনের এ ডামাডোলের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে করা একটি পোস্ট ঘিরে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জামায়াত দাবি করেছে, আমিরের অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড করে পোস্টটি করা হয়েছিল। কিন্তু এ ইস্যুতে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জামায়াতের আমিরসহ দলটির সমালোচনা করছে। বিশেষ করে ভোটের ঠিক আগে কর্মজীবী নারী ভোটারদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্যাতন প্রতিরোধ, তার অধিকার নিশ্চিত, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাসহ নারী উন্নয়নে যে সরকার পদক্ষেপ নেবে এবার নারীরা ভোটবিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদেরই ক্ষমতায় নিয়ে আসতে আগ্রহী।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনে নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ বলেই রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ভোট পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপপ্রচার চালিয়ে নারী ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টাও করছে। নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০ লাখ কম হলেও জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা বেশি। এজন্য নারীরা যাদের ভোট দেবেন, সে দলই জিতবে। কারণ, নারীরা দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের মনোনয়নের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি।’
এ নির্বাচনে নারীর অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নারী নেত্রীরা। সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘এতদিন বিভিন্ন জায়গায় নারীরা নেতৃত্বে ছিলেন, কিন্তু গত ১৮ মাসে নতুন করে মনে হয়েছে, এসব নারী কি এখন সবাই ফিরে যাবে? এভাবে ডিভাইড অ্যান্ড রুলের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাই দেশের মানুষকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কী ধরনের নেতৃত্ব চায়।’
আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ‘জুলাই সনদ ও গণভোটে বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কীভাবে এ প্রতিশ্রুতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে, তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। সম্প্রতি অনেক নারী বক্তব্য দিয়েছেন, তারা পুরুষের অধীন থাকতে চান। পুরুষ তাদের পরিচালক, এটা তারা মেনে নিয়েছেন। ওই নারীদের এ বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত। তাহলে এসব বক্তব্য আর আলোচনায় আসবে না।’