দীর্ঘ ২০ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বসছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর দলটি আজ বাদে কাল সরকার গঠন করবে।
সরকার গঠনের ঠিক এক দিন পর শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। তাই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে শুরুতেই রমজান মাসের ভোগ্যপণ্যের বাজারের পরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে। রোজার বাজার কীভাবে সামাল দেবে নতুন সরকার সেটি দেখার বিষয়।
Manual3 Ad Code
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের রোজার বাজারের পণ্য আমদানি থেকে শুরু করে সব প্রস্তুতিই নেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে। এবারের রোজার বাজারে পণ্যমূল্য বাড়লে নতুন সরকারের ঘাড়ে খুব বেশি দায় বর্তাবে না। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই বাজার ব্যবস্থাপনা কীভাবে সাজায় এবং পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নেয় সেটির প্রতিও দেশের মানুষের নজর থাকবে।
এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষক ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, এবার রোজার মাস শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে সরকারের দায়িত্ব নিচ্ছে বিএনপি। তাই এই নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা রোজার বাজার। যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে বাজার স্বাভাবিক রাখতে তেমন দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তাই নতুন সরকারের জন্য রোজার বাজার নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি হবে।
তিনি আরও বলেন, রোজার বাজারে নতুন সরকার কোনো কিছু করার সুযোগই পাবে না, তার আগেই পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। তাই প্রথম পরীক্ষায় বিএনপি সরকারের পাস-ফেল করার কোনো বিষয় না থাকলেও রোজার বাজার যদি বেশি বেসামাল হয়ে পড়ে তখন কিন্তু নতুন সরকারের ওপরও দায় চাপাবে অনেকে। এর আগের সরকারের আমলে দেখেছি বাজারে আগুন লাগলে ‘আমার কী’ এমন মনোভাব দেখাতে।
প্রতিনিয়ত মানুষ বাজার নিয়ে যন্ত্রণার শিকার হতো। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হলে সমালোচনা হয়। এ জন্যই মূলত বিএনপির জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাজারে ভোগ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে একরকম অনীহা দেখিয়েছে, তেমন দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। এ জন্য নতুন সরকারের কাছে রোজার বাজার নিয়ন্ত্রণ আরও চ্যালেঞ্জের হবে।
তা ছাড়া বিগত কয়েক মাস নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা গেছে, বাজারের দিকে তেমন কোনো নজরই ছিল না সরকারের। এরও একটা প্রভাব পড়তে পারে রোজার বাজারে।
নাজের হোসেন আরও বলেন, এবারের রোজার বাজার কেমন থাকবে সেটি নির্ভর করছে নতুন সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে কী উদ্যোগ নিচ্ছে তার ওপর। আগের সরকার বাজারে যারা অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে লুটপাট করলেও চুপ থেকেছে আগের সরকার। আমাদের বিশ্বাস নতুন সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বোঝাপড়া ভালো হবে। এই সরকার ব্যবসায়ীদের যেমন জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারবে, তেমনই বাজার নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আমার বিশ্বাস।
রোজার মাসে চাহিদা ও মজুদ পরিস্থিতি : এবার চাহিদার তুলনায় রমজাননির্ভর পণ্যের ৪০ শতাংশ বেশি মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। আমদানিতে পাইপলাইনে আছে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য, যা রোজার আগেই দেশে ঢুকবে। তবুও বাজারে ক্রেতার মনে ভর করেছে সিন্ডিকেট আতঙ্ক। প্রতি বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যবসায়ীরা দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও এর প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায় না বরং উল্টো মূল্য বৃদ্ধি পায়। এ জন্য সবাই সিন্ডিকেটকে দায়ী করলেও বরাবরই জড়িতরা থাকেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বছরে ভোজ্য তেলের চাহিদা ২৫ লাখ টন। এর মধ্যে রোজার মাসে চাহিদা ৩ লাখ টন। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ টন। আর সবশেষ নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টন। পাশাপাশি ওই দুই মাসে ৩ লাখ ৯২ টন ভোজ্য তেল আমদানি করতে এলসি খোলা হয়েছে, যা রোজার আগেই দেশে ঢুকবে। এতে দেখা যায়, রোজায় চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ মজুদ আছে।
মসুর ডাল বছরে চাহিদা সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন। এর মধ্যে রোজায় চাহিদা ৮০ হাজার টন। ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন। সবশেষ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৭২ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে আছে আরও ১ লাখ ৭৮ হাজার টন, যা রোজার আগেই দেশে ঢুকবে। এতে দেখা যায়, রোজার মাসের চাহিদার তুলনায় ইতিমধ্যে দেশে দ্বিগুণ মসুর ডালের মজুদ আছে।
বছরে দেশে চিনির চাহিদা মোট ২০-২১ লাখ টন। রোজায় চাহিদা ৩ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৩৭ হাজার টন। সবশেষ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে আছে ৩ লাখ ২৯ হাজার টন। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দেশে চিনির কোনো ঘাটতি নেই বরং রোজায় চাহিদার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চিনির মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে।
Manual3 Ad Code
এ ছাড়া দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন। রোজায় চাহিদা ৫ লাখ টন। এর মধ্যে এবার মৌসুমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৫ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে আছে আরও ৫৬ হাজার টন। দেখা যাচ্ছে শুধু রোজার চাহিদা নয়, বছরে চাহিদার তুলনায় দেশে বেশি পেঁয়াজ রয়েছে।
পাশাপাশি বছরে ছোলার চাহিদা সর্বোচ্চ ২ লাখ টন। এর মধ্যে রোজার মাসেই ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ২ লাখ টন ছোলার চাহিদা রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশে উৎপাদন হয়েছে ২২ হাজার টন।
সবশেষ গত দুই মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে আছে আরও ১ লাখ ৩০ হাজার টন, যা কয়েক দিনের মধ্যে দেশে আসবে। এতে রোজায় যে পরিমাণ চাহিদা, তা থেকে মজুদ অনেক বেশি। বছরে খেজুরের চাহিদা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে রোজায় চাহিদা ৬০-৮০ হাজার টন। গত দুই মাসে ১০ হাজার টন আমদানি হয়েছে ৫৬ হাজার টন আমদানি পর্যায়ে আছে, যা কয়েক দিনের মধ্যে দেশে ঢুকে যাবে।
বর্তমান পণ্যমূল্য পরিস্থিতি : রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ছোলা এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, যা এক মাস আগেও ১১৫ টাকা ছিল। আর দুই মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকায়, যা এক মাস আগে ১৯৮ টাকা ও দুই মাস আগে ১৯০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি সরু মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, যা এক মাস আগে ১৬০ টাকা ও দুই মাস আগে ১৫০ টাকা ছিল।
Manual4 Ad Code
প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, যা এক মাস আগে ১৫০ টাকা ছিল। আর দুই মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়, যা এক মাস আগে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর দুই মাস আগে ১৭০ টাকা ছিল। এ ছাড়া প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকায়, যা এক মাস আগে ১৩৫ টাকা ও দুই মাস আগে ১২৫-১২৬ টাকা ছিল।
প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়, যা গত মাসে ১১০ ও দুই মাস আগে ১১৫ টাকা ছিল। সুতরাং এখন অবধি বাজার বেসামাল না হলেও রোজার ঠিক এক দিন আগে এবং রোজার প্রথম দিন থেকেই বাজার টালমাটাল হয়ে যায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই কীভাবে বাজার সামাল দেয় সেটিই দেখার বিষয় বলে মত বিশ্লেষকদের।