প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

হঠাৎ আলোচনায় সড়ক-মহাসড়কের ‘চাঁদা’

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
হঠাৎ আলোচনায় সড়ক-মহাসড়কের ‘চাঁদা’

Manual1 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

ঢাকাসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির ঘটনা কয়েক দশকের পুরনো সমস্যা। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণত সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনসহ রাজনৈতিক দলের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের একশ্রেণির নেতাকর্মী দুর্বল সুশাসনব্যবস্থার সুযোগে ক্ষমতার জোর খাটিয়ে এই চাঁদাবাজি করে থাকে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাধর মন্ত্রী-এমপি কিংবা রাজনৈতিক নেতারা বরাবরই এর সমালোচনা করার পাশাপাশি চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনা ও প্রতিহত করার কথা বলে থাকেন। তবে এবার ঘটেছে ভিন্নÑ সদ্য গঠিত নির্বাচিত সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের চাঁদা আদায় সম্পর্কিত বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ‘নমনীয় ব্যাখ্যা’ দিয়ে এই মন্ত্রী রাজনৈতিক বিরোধীদের হাতে ‘সমালোচনার অস্ত্র’ তুলে দিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন, সেখানে তার মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্যের এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক কি না, তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।

 

Manual5 Ad Code

প্রসঙ্গত, রাজধানীসহ সারা দেশের জেলা-উপজেলায় পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি একটি নিয়মিত ঘটনা। এসব সড়কে চলাচলকারী রাজধানীমুখী পণ্য পরিবহনকারী যানবাহনে নিয়মিত চাঁদা তোলার কারণে ঢাকার সব বাজারে শাকসবজির দাম ‘আকাশছোঁয়া’। এসব অভিযোগ সাধারণত বরাবরই সরকার সমর্থক রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে উঠে থাকে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো কখনও কখনও এসব ক্ষেত্রে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিলেও কিছুদিন পর একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গেছে। কারণ সরকারদলীয় সমর্থক কেউ না কেউ সেই শূন্য জায়গা পূরণ করে, ফলে শুরু হয় আবারও চাঁদাবাজি। সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের একটি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল এবং স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়, যা প্রতি মাসে প্রায় ৬৭ কোটি এবং কখনও কখনও ৮০ কোটি টাকায় ঠেকে।

 

চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রীর ভাষ্য

চলতি মাসে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সরকারের মন্ত্রিসভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেল মন্ত্রণালয় এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলম। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকের মুখোমুখি হওয়ার পর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয় সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে।’

এই বক্তব্যের পর সমালোচনা শুরু হয়। রাজনৈতিক সংগঠন ও অতীত এবং বর্তমানের সরকার সমর্থক শ্রমিক নেতাদের চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতার চাঁদাবাজি

গত দেড় দশকে গুরুতর চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ও তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। রাজধানী ঢাকা ও এর উপকণ্ঠের সড়কে চলাচলকারী প্রায় ১৫ হাজার বাস থেকে টানা ১৫ বছর প্রতিদিন ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে।

গণঅভ্যুত্থানের পরও চাঁদাবাজি

২০২৫ সালের মে মাসে গণমাধ্যমে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, আরিচা, পাটুরিয়া, ঘিওর, হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ থেকে ৭ শতাধিক পরিবহন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতিদিন চলাচল করে। এসব পরিবহন থেকে প্রতিদিন দেড় থেকে ২ কোটি টাকা বিভিন্ন অজুহাতে আদায় করা হতো।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের একটি তথ্যমতে, চট্টগ্রামে পরিবহন খাত থেকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে ১৬ বছরে একটি গ্রুপ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাস টেম্পো-ট্যাক্সি, মিনিবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয় তারা।

Manual7 Ad Code

২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশ করা এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন পরিবহন খাত থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। অনেকের সঙ্গে এই চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন প্রতিনিধিরা। এই প্রতিবেদন মতে, টানা দেড় দশক সাবেক সরকারি দল আওয়ামী লীগ পরিবহন খাতের চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করলেও ২০২৪-এর পটপরিবর্তন ও সংসদ নির্বাচনের পর এ খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপিপন্থী পরিবহন নেতারা।

এরই মধ্যে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম নিজেই চাঁদাবাজি সম্পর্কে নমনীয় সুরে কথা বলায় অলিখিতভাবে চাঁদাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার অনেকে এও মনে করছেন, মন্ত্রীর এই বার্তার পর তার নিজ দলীয় সমর্থক ও বেপরোয়া নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

Manual5 Ad Code

যা বলছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ বিএনপির কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করেছিল, চাঁদাবাজি নিয়ে পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য তার উল্টো বার্তা দিল। যদি এটি তিনি অসচেতনভাবে করতেন, তবে এত দিনে এর একটি ব্যাখ্যা আসত। তা না আসায় মনে হচ্ছে বক্তব্যটি তিনি সচেতনভাবেই দিয়েছেন। এর ফলে নতুন সরকার গঠন করা বিএনপির ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হয়েছে। চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বাড়ে। জনগণের কাছে বিষয়টি অসন্তোষের। মোটকথা, দলগতভাবে বিএনপির বেশ দুর্নাম হয়েছে এবং মানুষ হতাশ হয়েছে এতে।

অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত : রাশেদা কে চৌধুরী

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মন্ত্রীর এ বক্তব্য পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। জনগণ এতে হোঁচট খেয়েছে। জনগণকে বাদ দিয়ে চাঁদাবাজদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মানুষ প্রায় দুই দশক পর বিএনপি সরকারের কাছে যে পরিবর্তন আশা করছে, এ বক্তব্য তার পরিপন্থী। মন্ত্রীর এ বক্তব্যের ফলে দল, সরকার এবং সরকারপ্রধান বিতর্কিত হয়েছেন। চাঁদাবাজরা শক্ত ভিত পেয়েছে।

সরকারপ্রধানের ভাষণের অবমাননা : ইফতেখারুজ্জামান

এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রীর ব্যাখ্যা সরকার ও তার নিজের দেওয়া দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। এটি শাসক দলের নির্বাচনী ইশতেহার এবং খোদ সরকারপ্রধানের ভাষণেরও অবমাননা। মন্ত্রী যেভাবেই সাফাই গান না কেন, এই যোগসাজশমূলক দুর্নীতির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই চাপে।’ এই বক্তব্য প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান তিনি।

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘সরকার যদি মন্ত্রীর বক্তব্য সরাসরি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান না করেন, তাহলে এমন ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না যে, প্রকারান্তরে সরকারের একজন মন্ত্রী জনগণকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি করতে উৎসাহ দিচ্ছেন; যা সরকারের জন‍্য আত্মঘাতী। দুর্নীতির ভুক্তভোগী দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন‍্য হতাশাজনক।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code