ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় আসে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অনেক। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত সরকার প্রশাসনিকভাবে অনেকটাই ব্যর্থ- তারা প্রশাসন সাজাতে ভুল করেছে। সেই খেসারত তাদের ১৮ মাসের মেয়াদের পুরোটা সময় ধরে দিতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পর এখন ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। সে কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনেও আমলাতন্ত্র সংস্কারের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা।
তারা বলছেন, ন্যায়নিষ্ঠ ও নির্মোহভাবে প্রশাসনে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় বসাতে না পারলে সরকারের এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। সরকার যে লক্ষ্য ঠিক করেছে তা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে বলে শঙ্কা তাদের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তারা আওয়ামী লীগ আমলের আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে সরিয়ে নিজেদের মতো একটি প্রশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। শীর্ষ পদগুলোতে তারা অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু পদায়ন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত বারবার বিতর্কের জন্ম দেয়। বেশির ভাগ সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেনি প্রশাসন। ক্ষোভ, বিক্ষোভ, অসন্তোষ, আন্দোলন মোকাবিলায় কেটেছে সরকারের প্রায় পুরোটা সময়।
আর সংস্কার ও পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা পূরণ হয়নি। প্রশাসনও সেই আগের তিমিরেই ঘুরপাক খাচ্ছে বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনকে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে দুর্বল প্রশাসন হিসেবেও অভিহিত করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করা হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত বড় একটি অভ্যুত্থানের পরও কোনো গুণগত পরিবর্তন আমরা দেখছি না। সরকারগুলো এসেই নিজের লোক খোঁজে; দক্ষ, নিরপেক্ষ ও সৎ লোক খোঁজে না। কিছু কর্মকর্তা যখন দলবাজি করে পদোন্নতি, ভালো পদ-পদবি বাগিয়ে নেন তখন অন্যরাও তাদের দেখে উৎসাহিত হন। এভাবেই জিনিসটি ছড়িয়ে পড়ে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমরা দলাদলি চাই না। দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করলে কেউ আর দলাদলিতে আসবে না। আশা করি, বর্তমান সরকার এ বিষয়টি অনুধাবন করবে।’
সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘আমি উদ্বিগ্ন আমলাতন্ত্র নিয়ে। কারণ আমলাতন্ত্রটাকে যদি আপনি ভালোভাবে সাজাতে না পারেন, যদি সৎ লোক, দক্ষ লোক খুঁজে বের করতে না পারেন— যেমন শেখ হাসিনার আমলে দলদাস এবং দুর্নীতিবাজ এই দুইটা ছিল ওনার অগ্রাধিকার। এখন ভালোদের খুঁজে বের করা দরকার। সরকার কেমন চলবে এটা নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার ওপর, কিন্তু ইন্ডিভিজুয়াল মন্ত্রণালয়গুলো কেমন চলবে এটা ৯০ শতাংশ হলো সচিবের ওপর। কারণ মন্ত্রীকে তো কেউ চিঠি লেখে না। সচিব কোনটা দুই ঘণ্টায় নিষ্পত্তি করবেন, কোনটা দুই দিনে করবেন এটা সচিবের বিষয়।’
Manual2 Ad Code
তিনি বলেন, ‘এখন সচিব যদি টাকা-পয়সার দালালি বা দলাদলি করেন তবে সমস্যা। আমি বেশি উদ্বিগ্ন সচিব এবং সংস্থা প্রধানদের নিয়ে। সংস্থা প্রধান এবং সচিব—এই দুইটা যদি সাজাতে না পারে তাইলে আপনার সরকার ভালো চালানো কঠিন। সচিব হলো পলিসি লেভেলে, কিন্তু আসল বাস্তবায়নকারী হইলো সংস্থা প্রধান।’
‘সব জায়গা ঠিকভাবে সাজাতে না পারলে শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে বাস্তবে কোনো লাভ হবে না।’ বলেন সাবেক আমলা আব্দুল আউয়াল মজুমদার।
Manual7 Ad Code
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, এখন তো জনপ্রশাসনটা একটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে, এই জনপ্রশাসনকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য তো দক্ষ লোক দরকার।’
তিনি বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ লোক, একদম নিরপেক্ষ লোক তো পাবেন না- তাদের খুঁজে বের করতে হবে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, নিরপেক্ষতা এবং সততা- এগুলো দেখে যদি জনপ্রশাসনটাকে যদি না সাজানো যায়, যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় সাজায়, তাহলে কিন্তু আপনার এই যে ভবিষ্যৎ, আপনার সবকিছু সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। প্রশাসনও আরও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। প্রশাসনের সহায়তা ছাড়াও তো অঙ্গীকারগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে না।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল প্রশাসন মন্তব্য করে প্রশাসন বিষয়ক বহু গ্রন্থের রচয়িতা ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘এ সরকারের প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে যারা ছিলেন তারা কেউই যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারেননি।’
প্রশাসনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে জানতে চাইলে টেলিফোনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, ‘এটা নিয়ে এখন কথা বলা সম্ভব নয়। পরে একসময় আসেন কথা বলা যাবে।’
Manual2 Ad Code
শীর্ষপদ থেকে আগের কর্মকর্তাদের সরানো হচ্ছে
সরকার তাদের মতো করে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে আগের সরকারের কর্মকর্তাদের সরাতে শুরু করেছে। যদিও সেভাবে নিয়োগ এখনো শুরু হয়নি।
বিএনপি নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পাওয়ার পরপরই মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ পদত্যাগ করেন। এরপর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার একদিন আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদও বাতিল করা হয়। তিনিও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।
এরপর গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া নয় সিনিয়র সচিব ও সচিবের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। এরা সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। প্রায় সবার মেয়াদই চলতি বছরের শেষের দিকে শেষ হওয়ার কথা।
Manual2 Ad Code
একই দিন (সোমবার) গত সরকারের সময়ে সচিব হওয়া তিনজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ধর্মসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এক বছর মেয়াদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। খালি হওয়া পদগুলোতে আরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদও বাতিল করা হয়। তিনিও পদত্যাগ করেছিলেন। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।