প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৪:৪৫ অপরাহ্ণ
বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

ঈদুল ফিতর সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শ্রমঘন শিল্পে বেতন ও উৎসব বোনাস পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন শিল্প মালিক ও শ্রমিক নেতারা। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে আগাম প্রস্তুতি ও নজরদারি জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

ঈদের আগে ৫০-৬০টি কারখানায় শ্রম অসন্তোষের আশঙ্কা : ঈদুল ফিতর সামনে রেখে তৈরি পোশাক খাতের ৫০ থেকে ৬০টি কারখানায় শ্রম অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
বকেয়া মজুরি ও ঈদ বোনাস পরিশোধে জটিলতা তৈরি হলে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন। নতুন সরকারের জন্য তা যেন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি না করে, সে বিষয়ে আগাম সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

Manual8 Ad Code

পোশাক শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়, যা অনেক সময় আন্দোলন বা কর্মবিরতিতে রূপ নেয়। এতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার আশঙ্কা থাকে।
তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় আগাম পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এদিকে ঈদপূর্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আগামী মঙ্গলবার ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ কমিটির (টিসিসি) বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোয় বিশেষ নজরদারি

জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ঈদের আগেই বকেয়া মজুরি পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ২০ রমজানের আগেই শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ও ঈদ বোনাস পরিশোধের দাবি জানাচ্ছি।’

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সময় মতো বেতন-বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য শ্রম অসন্তোষ এড়ানো সম্ভব হবে। ঈদ সামনে রেখে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিস্থিতিও বজায় থাকবে।

নগদ প্রণোদনা ও সফট লোন চায় বিজিএমইএ : ঈদুল ফিতরের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধে সম্ভাব্য আর্থিক চাপ মোকাবেলায় স্বল্প সুদে ঋণ (সফট লোন) ও বকেয়া নগদ প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড়ের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। এ বিষয়ে সংগঠনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।

গত মঙ্গলবার বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এনামুল হক খান বাবলু ও সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চিঠি হস্তান্তর করেন। পরে শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, খাতটির প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার নগদ প্রণোদনা এখনো বকেয়া রয়েছে। ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে যাতে কারখানাগুলো সংকটে না পড়ে, সে জন্য দ্রুত এই অর্থ ছাড়ের অনুরোধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ সহজ শর্তে সফট লোন চাওয়া হয়েছে। বিজিএমইএর হিসাবে খাতটির মাসিক বেতন প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী দুই মাসে প্রয়োজন প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সংগঠনটি জানিয়েছে, সব কারখানা সমান প্রণোদনা পায় না। বিশেষ করে ওভেন ও সোয়েটার কারখানাগুলো তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে থাকবে।

Manual7 Ad Code

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছেন এবং স্যালারি সাপোর্টের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে উত্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।

শ্রমিকদের উদ্বেগ বাড়ছে : গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘এ অঞ্চলের (আশুলিয়া) অনেক কারখানার শ্রমিক ঈদের আগে মজুরি ও বোনাস পাওয়া নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। কিছু কারখানায় নির্বাচন ও আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়াকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।’ তিনি জানান, কিছু কারখানা এখনো জানুয়ারি মাসের মজুরি পরিশোধ করতে পারেনি এবং ঠিকাদারি ভিত্তিতে পরিচালিত কারখানাগুলোতে বকেয়া পরিশোধে বেশি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কঠিন সময় পার করছে পোশাক খাত : জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘বিশ্ববাজারে পোশাকপণ্যের চাহিদা হ্রাস ও দরপতন, উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। ফেব্রুয়ারি মাসে দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ও বিভিন্ন কারণে ২৮ দিনের মাসে কার্যকর উৎপাদন কার্যদিবস কমে মাত্র ১৯ দিনে নেমে এসেছে। ফলে শিপমেন্ট ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক কারখানা তারল্য সংকটে পড়ছে। এ অবস্থায় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও উৎসব বোনাস সময় মতো পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, ‘বহু প্রতিষ্ঠানের নগদ সহায়তার আবেদন লিয়েন ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট প্রক্রিয়ার জটিলতায় আটকে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বস্ত্র ও পোশাক খাতে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে। দ্রুত এসব অর্থ ছাড় করা হলে কারখানাগুলোর তারল্য সংকট অনেকটাই কমবে।’

বিজিএমইএ নেতারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নগদ সহায়তা ছাড়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস প্রদানে সহায়তার জন্য দুই মাসের মজুরির সমপরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ঋণ তিন মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ ১২ মাসে পরিশোধের সুযোগ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

নজরদারি বাড়াচ্ছে শিল্প পুলিশ : আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মনিনুল ইসলাম জানান, ঈদ বোনাস ও মজুরি পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং কিছু কারখানার শ্রমিকরা এরই মধ্যে বিক্ষোভ ও মিছিল করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আশুলিয়া এলাকায় এখনো ৬০টির বেশি কারখানায় জানুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি এবং প্রায় ৩০টি কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন ও বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া একটি সোয়েটার কারখানায় ৫৪ জন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছিলেন, পরে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা না গেলে ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা বাড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় আগাম সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

Manual1 Ad Code

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বেতন ও মজুরি পরিশোধে অক্ষমতার কারণে ঈদের আগে বা পরে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর গাজীপুরে নেক্সট জেনারেশন গ্রুপের একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ওই কারখানার শ্রমিকরা এখনো প্রায় ১৮ কোটি টাকার বকেয়া মজুরি পাননি এবং প্রায় চার হাজার ৫০০ শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছেন।’

আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বকেয়া মজুরির দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নেমে মিছিল ও বিক্ষোভ করছেন। সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।’

২০ রমজানের মধ্যে বকেয়া মজুরি-বোনাস পরিশোধের দাবিতে মানববন্ধন : আগামী ২০ রমজানের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সব বকেয়া মজুরি ও ঈদ বোনাস পরিশোধের দাবিতে গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে সংগঠনের সভাপতি ও সদস্যসচিব এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন সহিদের সভাপতিত্বে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক।

নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২০ রমজানের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে, যার দায় বর্তমান সরকারকে বহন করতে হবে। তাঁরা অভিযোগ করেন, এখনো অবৈধ ছাঁটাই, হামলা-মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বকেয়া মজুরি পরিশোধে গড়িমসি বন্ধ হয়নি।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code