মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতায় সারা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহই বিঘ্নিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সীমান্ত অঞ্চলে তেল পাচারকারী চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। চক্রটি ভারতে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের সুযোগ নিয়ে তেল পাচারের দিকে ঝুঁকেছে। তবে পাচারকারীদের ঠেকাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বুধবার জানিয়েছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব সীমান্ত এলাকায় পড়তে শুরু করেছে। এজন্য পাচার প্রতিরোধে টহল, চেকপোস্ট তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’ সব ব্যাটালিয়নকে কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরা ও লালমনিরহাট সীমান্তে বিশেষ নজরদারি চলছে। বিশেষ করে বেনাপোল স্থলবন্দর ঘিরে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিজিবি সূত্র জানায়, ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের সময় ট্যাংকে থাকা জ্বালানির পরিমাণ মেপে হিসাব রাখা হচ্ছে। পণ্য খালাস শেষে ফেরার সময় আবারও তেল পরিমাপ করে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সামান্য অমিলও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
Manual2 Ad Code
বেনাপোল বন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিজিবির পাশাপাশি বন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরাও সতর্ক রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় ট্রাকে তেল সরবরাহকে কেন্দ্র করে বন্দর এলাকায় একটি চক্র সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছিল, যা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
বিজিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক দিনের নজরদারিতে বড় ধরনের কোনো পাচারের প্রমাণ মেলেনি। তবে দুয়েক লিটার তেলের অমিল পাওয়া গেছে, যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৯৬ রুপি এবং ডিজেল ৮৯ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় পেট্রল প্রায় ১৩০ টাকা ও ডিজেল ১২০ টাকার সমান। এই মূল্য ব্যবধানই পাচার চক্রের প্রধান প্রণোদনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিজিবি বলছে, সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। বৈশ্বিক অস্থিরতার সুযোগে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে দেওয়া হবে না। সীমান্তে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বাড়ছে চাপ
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠেছে এবং ডব্লিউটিআই দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ৩৭ ডলারে। অপরিশোধিত জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সেখানে সামরিক উত্তেজনা ও ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এলএনজির দাম ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
Manual6 Ad Code
Manual7 Ad Code
দেশে মজুদ পরিস্থিতি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। এর মাঝে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুদ আছে।
Manual6 Ad Code
ইতোমধ্যে ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিকল্প বাজার খোঁজা হচ্ছে। তবে বর্তমান মজুদ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সংকট বা মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই।’ এদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের প্রায় শতভাগ জ্বালানি আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত জ্বালানির পুরোটা আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। গ্যাস চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ঝুঁকি তৈরি করছে পাচার চক্রের তৎপরতা।