বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মামলাজট এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার্যকর নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে এই জট কমছে না; বরং দিন দিন তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় নিঃস্ব হচ্ছেন অসহায় বিচারপ্রার্থীরা, আর বিচার বিলম্বের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ও আদালতের প্রতি আস্থা কমছে।
Manual3 Ad Code
পরিসংখ্যানে মামলার পাহাড়
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লক্ষ ৪২ হাজার ৭৩১ টি। এর মধ্যে— আপিল বিভাগে ৪১ হাজার ৫৫১টি মামলা, হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৫৬টি মামলা, অধস্তন আদালতগুলোতে ৪০ লক্ষ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর— এই তিন মাসেই নতুন করে দায়ের হয়েছে ৪ লক্ষ ৩৬ হাজার ৪৭৯টি মামলা।
Manual5 Ad Code
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও অসন্তোষ
আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার বাদী ও অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন বলেন, “আমরা যে স্বাধীন বিচার বিভাগের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সংস্কার কমিশনে কাজ করেছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখনও বিচার বিভাগে পূর্ণ স্বাধীনতা আসেনি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও বিচারক নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে কর্মপরিবেশ তৈরি হয়নি, যার ফলে মামলাজট কমছে না।”
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, “বর্তমানে প্রচুর ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা হচ্ছে, যার অনেকগুলোই ‘মব সৃষ্টির’ উদ্দেশ্যে করা। চাপের মুখে বিচারকরা অনেক সময় অগ্রহণযোগ্য মামলাও খারিজ করতে পারছেন না। এছাড়া রাজনৈতিক মামলায় অনেক সময় নাম না থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করছে, যা উচ্চ আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রধান বিচারপতি সপ্তাহের পাঁচদিনই কোর্টে বসছেন না। তার আগের প্রধান বিচারপতি (বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ) সপ্তাহে মাত্র তিনদিন কোর্টে বসতেন। তাই মামলার আধিক্য হ্রাস পায়নি বরং বেড়েছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি এই বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের বক্তব্য
Manual5 Ad Code
মামলাজট নিরসনে নিজেদের ভূমিকার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক বলেন, “মামলাজট কমাতে আমাদের খুব বেশি করার থাকে না, তবে আমরা শুনানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় নেই না। শুধুমাত্র অতি প্রয়োজনীয় মামলাগুলোতেই আমরা আপিল করি এবং দ্রুত শুনানি শেষ করার চেষ্টা করি। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে সময়ক্ষেপণের কোনও সুযোগ নেই।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (মেডিয়েশন) জোরদার করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া এই মামলার পাহাড় ডিঙানো সম্ভব নয়।