প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ

editor
প্রকাশিত মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যার সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত, কৃষি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সমস্যার সঙ্গে বৈশ্বিক ঝুঁকি যুক্ত হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সরকারের জন্য আগামী সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

এরই মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কাতার। পরিস্থিতির কারণে কাতারএনার্জি তাদের কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে। এর ফলে ইতালি, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের মতো দেশগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং তার প্রভাব দ্রুত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়ে।

জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

Manual3 Ad Code

দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চালক তেল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। পাম্প মালিকদের দাবি— চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে তেল কেনার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতার কারণেই অনেক পাম্পে আগেভাগে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

Manual4 Ad Code

মন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে তেল মজুত না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘চাহিদা স্বাভাবিক থাকলে সরবরাহও স্বাভাবিক থাকবে।’’

জ্বালানি সংকটের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই তার প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে এবং লোডশেডিং বাড়তে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল এবং সার কারখানার মতো শিল্প খাতে উৎপাদন কমে গেলে রফতানি আয়ও কমে যেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ পড়বে।

পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়বে। ডিজেল ও অকটেনের ঘাটতি হলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে এবং বাজারে পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।

কৃষি খাতও ঝুঁকির বাইরে নয়। সেচ পাম্প, ট্রাক্টর এবং কৃষিযন্ত্র চালাতে জ্বালানি প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট হলে সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ

জ্বালানি সংকট হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হয়। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, সামনে তেলের দাম বাড়তে পারে এবং এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।

 

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য চাপ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট তীব্র হলে লোডশেডিং বাড়বে এবং শিল্প উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে সার, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ ও স্টিল শিল্পের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

রফতানি শিল্পে উদ্বেগ

রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গ্যাস সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনে।

তার মতে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, কাতার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য গ্যাসের উৎস ছিল। এখন যদি অন্য উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করতে হয়, তাহলে বেশি দাম দিতে হতে পারে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শিল্প খাত কতটা বহন করতে পারবে সেটিও বড় প্রশ্ন।

 

সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো— এই চারটি বিষয় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

তার ভাষায়, “মানবদেহে যেমন দুটি ফুসফুস থাকে, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তেমন দুটি ফুসফুস রয়েছে— জ্বালানি ও ব্যাংক খাত। বর্তমানে এই দুই খাতই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’’

 

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, উচ্চ সুদহার ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত এক বছরে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে গেছে।

অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দুর্বলতা এবং কিছু উদ্যোক্তার দেশ ছেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, কেবল দেশীয় বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা

দেশের ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণের উচ্চমাত্রা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অনাদায়ি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনার চাপ

অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতির আকারের তুলনায় রাজস্ব আয়ের পরিমাণ এখনও কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

 

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জোরদার করা এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী উৎস খুঁজে বের করা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

Manual3 Ad Code

সামনের পথ

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপের মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

Manual6 Ad Code

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই চাপ কিছুটা লাঘব করা সম্ভব। নতুন সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে পারে— সেদিকেই এখন দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের নজর।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code