প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

নির্বাচন ২০২৬: শাস্তির আওতায় আসেনি ৭০ শতাংশ অপরাধ

editor
প্রকাশিত মার্চ ২৮, ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
নির্বাচন ২০২৬: শাস্তির আওতায় আসেনি ৭০ শতাংশ অপরাধ

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যু হয়। এরপর গত ২৮ জানুয়ারি বিকেলে শেরপুর-৩ আসনের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিম গুরুতর আহত হন। পরে ওই দিন রাতেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

Manual8 Ad Code

নির্বাচনের আগে বহুল আলোচিত এই দুই ঘটনায় সহিংসতার আশঙ্কা ও ভোটের পরিবেশ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়ে। এর পরও থামেনি নির্বাচনি সহিংসতা, সংঘর্ষ, মৃত্যু। সহিংস ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ জন, আহত লোকের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবারের সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় জমা পড়া মোট অভিযোগ ৮৪২টি। ৩০ জেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ২০০টির বেশি। সহিংস ঘটনায় তদন্তাধীন মামলা ২৪৮টি, এসব মামলায় মোট আসামি ৩৩৮ জন।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সহিংসতায় ১০ জন নিহত এবং প্রায় আড়াই হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৭০০টির বেশি সহিংস ঘটনার তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছেন। ভোটের দিনও অনিয়ম ও সংঘর্ষের অভিযোগ ছিল। সারা দেশে ৩৯৩টি অনিয়মের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রভিত্তিক বিশৃঙ্খলা, সমর্থকদের সংঘর্ষ, ব্যালট স্টাফিংয়ের অভিযোগ, পোলিং এজেন্ট অপসারণ এবং ভোটারদের বাধা দেওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এমনকি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরও সহিংসতা থামেনি।

বিভিন্ন জেলায় ২০০টির বেশি সংঘর্ষের ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় অন্তত ৩৫০টি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন সহিংস এসব ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা জড়িত।

Manual6 Ad Code

 

নির্বাচনি অপরাধ: তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা

নির্বাচন কমিশনের ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি অ্যান্ড এডজুডিকেশন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জমা পড়া মোট ৮৪২টি অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় তদন্তের ভিত্তিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৩৮টি ঘটনায় সতর্কতা জারি, ১২টি ক্ষেত্রে বিতর্কিত কনটেন্ট অপসারণ এবং ১৩টি ঘটনায় বেআইনি পোস্টার ও ব্যানার সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ২৬৩টি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

তবে সব অভিযোগ মামলায় রূপ নেয়নি। মোট অভিযোগের বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ২৪৮টি, বাকি ৫৯৪টি বা প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনায় জমা পরা অভিযোগ এখনো সরাসরি মামলার আওতায় আসেনি। এ ছাড়া সারা দেশে ২৪৮টি মামলায় ৩৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার রায়ে ৩০৯ জনকে মোট ১৮ লাখ টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কারাদণ্ড হয়েছে। ঢাকা অঞ্চলে দুজনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং আরও দুজনকে ২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রাজশাহীতে ৫২টি মামলায় ৭৫ জন এবং চট্টগ্রামে ৪৬টি মামলায় ৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া খুলনা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রংপুর ও বরিশাল অঞ্চলেও একাধিক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।

 

আলোচিত মামলাগুলোর পরিণতি

নির্বাচনের আগে সংঘটিত আলোচিত দুটি সহিংস ঘটনার মামলাও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলাটি বর্তমানে পুনঃতদন্তাধীন রয়েছে। আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলাটি এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে ঘটনার দায় নির্ধারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের আগে আলোচিত এই দুই মৃত্যুর ঘটনার এখনো বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

 

Manual7 Ad Code

নির্বাচনি অপরাধ: ইসির ব্যাখ্যা

Manual7 Ad Code

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘নির্বাচনি অপরাধের ক্ষেত্রে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, অভিযোগ পেলেই দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে জমা পড়া অভিযোগগুলো কমিশনের অনুসন্ধান ও বিচার কমিটি মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছে। সব ঘটনা তদন্ত করে মামলা, জরিমানা বা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সহিংসতার ইতিহাস: ২০১৪-২০২৪

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা নতুন নয়। আগের নির্বাচনগুলোতেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৫৩০টি সহিংস ঘটনায় ১১৫ জন নিহত হন, যা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সহিংস নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৪১৪টি সহিংস ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত হন।

২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময়ও ৫৩৪টি সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৬ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হন। এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনায় মোট অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে এসব ঘটনার বিচারের নজির খুব কম।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদসহ যেকোনো নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী।

তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনি সহিংসতা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’

তার মতে, অভিযোগ তদন্ত ও শাস্তির উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও সব ঘটনার কার্যকর বিচার নিশ্চিত না হলে সহিংসতার প্রবণতা পুরোপুরি কমবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code