জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন তথা সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া ক্রমেই জটিল পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মতপার্থক্য ক্রমশই প্রকাশ্যে আসছে। সর্বশেষ গত রবিবার রাতে সরকার পক্ষের সনদ বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত গণভোট অধ্যাদেশ বিল আকারে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ অবস্থায় সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত বিতর্কের স্রোতোধারা সংসদকে ছাড়িয়ে রাজপথেও গড়াতে পারে। সংসদের মতানৈক্য নিরসনের পথ যদি সংসদেই নির্মাণ করা সম্ভব না হয়, তা হলে দেখা দিতে পারে অস্থিরতা। এ কারণে সংসদ যেমন অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে, তেমনি রাজপথও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। অতীতের মতো অস্থিরতার বৃত্তে ফিরে যেতে পারে রাজনীতি।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশসহ অন্তত ২০টি অধ্যাদেশ বিল আকারে জাতীয় সংসদে না তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশেষ কমিটি। গত রবিবার রাতে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে প্রণীত প্রতিবেদন আগামী ২ এপ্রিল সংসদে জমা দেওয়া হবে। তবে কমিটির বিএনপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিরোধী দলের বা জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিরা একমত হতে পারেননি। তাদের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত গণভোট অধ্যাদেশ বিল আকারে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী পক্ষ বলছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন তথা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে গড়িমসি শুরু করেছে। তারা গণরায়কে উপেক্ষা করতে চাইছে। যে কারণে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন সংক্রান্ত আলোচনার জন্য স্পিকারের প্রতি সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের আহ্বান জানানোর নোটিস দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার এই বিষয়ে দুই ঘণ্টা আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যরা বলছেন, তারা সংসদে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটলে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত রবিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে কমিটির তৃতীয় দিনের বৈঠকে গণভোট অধ্যাদেশ ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল একমত হয়নি। সরকারি দল মানবাধিকার কমিশন, বিচারপতি নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনতে চাইছে। কিন্তু এতে আপত্তি জানিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বৈঠকের পর কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আভাস দিয়েছেন, গণভোট অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে না। অর্থাৎ, অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যাবে। অন্যদিকে কমিটির সদস্য জামায়াত এমপি রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, গত রবিবার ২২টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গণভোট, মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মতো ১৫টি অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করার পর স্বাক্ষরিত হয়। তবে সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। এরপর গত বছর ১৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সময় দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়। গণভোট আয়োজনে জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে এই আদেশ জারির পর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ীদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। সেজন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আলাদাভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। কিন্তু নির্বাচনে দুইÑতৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ায় শুরুতেই জটিলতা দেখা দেয়। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিÑ এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের এমপিরা বিএনপির ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো অধ্যাদেশ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করতে হয় এবং অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলো পাস হতে হয়। তা না হলে সেগুলোর আইনি বৈধতা থাকে না। সে কারণে গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশন শুরুর দিনই ১৩৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে সেগুলো যাচাই-বাছাই করতে ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়। এই কমিটিতে জামায়াতের এমপিরাও প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ সময় জামায়াত ১২ মার্চ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের দাবি জানালেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সেই পথে না হেঁটে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করে। জামায়াত এমপিরা সংসদের অধিবেশন মুলতবি করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান জানালে নিয়ম মেনে নোটিস দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গত রবিবার জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশের (আদেশ নং ১, ২০২৫) অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি এ সময় এ আলোচনার প্রয়োজনে ৭১ বিধি ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনাও বাতিলের দাবি করেন। এ নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক হয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ নোটিসের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা সংশোধন করে আবারও উত্থাপন করার প্রস্তাব দিলে সংসদে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা হয়। পরে সব পক্ষের আলোচনার পর মঙ্গলবার (আজ) অধিবেশনের শেষের দুই ঘণ্টা এ বিষয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারণ করে দেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
Manual8 Ad Code
এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি দল ও বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে বিষয়টি নিয়ে সংসদ অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গণভোট অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্তও নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
Manual2 Ad Code
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘বর্তমান সরকার শুরু থেকেই সংসদে এবং অন্যান্য কার্যক্রমে জুলাই সনদ এবং গণভোটকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের কথা বলার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। যখন কথা বলার সুযোগ চেয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে নোটিস দিলেন, তখন সেটাকে নিয়েও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলো এবং তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো। আসলে জুলাই গণঅভুত্থান, জুলাই সনদ এবং গণভোটের জনরায়কে সরকার একধরনের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন এবং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘সংসদের আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে আমাদের রাজপথ বেছে নিতে হতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমাদের জোটসঙ্গীদের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে।’
Manual5 Ad Code
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, ‘গণভোট-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে এই গণভোট বাতিল করা হলে নির্বাচিত সংসদ আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারে।’
Manual2 Ad Code
প্রসঙ্গত, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১১ দলের পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করতে গত ২৮ মার্চ জোটের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে তা পেছানো হয়েছে। বৈঠকটি আগামী সপ্তাহে হতে পারে।