প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৮ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে কমছে রপ্তানি আদেশ, বাড়ছে ব্যয়

editor
প্রকাশিত মার্চ ৩১, ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে কমছে রপ্তানি আদেশ, বাড়ছে ব্যয়

Manual1 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

একমাস ধরে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্ন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং চাহিদা হ্রাস—সব মিলিয়ে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বল্পমেয়াদে খরচ বৃদ্ধি ও অর্ডার কমার চাপ থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের রপ্তানি কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংঘাতের প্রভাব মূলত তিনটি পথে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে—জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে চাহিদা হ্রাস।

এর ফলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক (আরএমজি), চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো অন্যান্য রপ্তানি খাতও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

 

Manual4 Ad Code

আর এটা মূলত যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটে ভোক্তাদের আয় কমে যাওয়ায় আমদানিকারক বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

 

রপ্তানি কমছে, অর্ডার স্থগিত

 

বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এয়ার কার্গো মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাব—বিশেষ করে দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়ায় দ্রুত পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসূর বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংকটের কারণে শাকসবজি ও ফল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইউকে, ইতালি ও টরন্টো—এই কয়েকটি গন্তব্যে সীমিত পরিসরে কিছু ফ্লাইট চললেও মোটের ওপর প্রায় ৮০ শতাংশ রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন মাত্র ২০-২৫ শতাংশ পণ্য অল্প পরিসরে যাচ্ছে, সেটাও নিয়মিত নয়। বাকি ফ্লাইটগুলো চালু না হওয়া পর্যন্ত রপ্তানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, কারণ কার্যত এয়ার কার্গো ব্যবস্থা অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে।’

 

ট্রানজিট জটিলতার বিষয়ে মোহাম্মদ মনসূর বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাবগুলো—বিশেষ করে দুবাই ও কাতার—অনেক ক্ষেত্রে আনচার্টার্ড বা তৃতীয় দেশের কার্গো গ্রহণ করছে না। ফলে ইউরোপগামী পণ্য পরিবহন আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে শাকসবজি ও ফল রপ্তানি প্রায় বন্ধের মতো অবস্থায় রয়েছে। খুব সীমিত আকারে কিছু চালান গেলেও তা নিয়মিত বা উল্লেখযোগ্য নয়।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘চলমান যুদ্ধের প্রভাব চামড়া খাতের রপ্তানিতে ভয়াবহভাবে পড়েছে। নতুন করে রপ্তানি আদেশ আসছে না, আগের অর্ডারগুলোও অনেক ক্ষেত্রে ধীর হয়ে গেছে। অনেক পণ্য প্রস্তুত থাকলেও শিপমেন্টের কোনো নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম পাচ্ছি না।’

তিনি বলেন, ‘রাসায়নিক পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে, বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি করা কেমিক্যালগুলোর ক্ষেত্রে। কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহকারীরা বুকিংও নিচ্ছে না, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’

Manual7 Ad Code

 

জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘সরাসরি বড় ধরনের প্রভাব এখনো না পড়লেও পরিবহন খরচ বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেওয়ায় আগের তুলনায় খরচ বেশি হচ্ছে।’

অর্ডারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা অনুযায়ী, চলমান অর্ডারের অন্তত ৫ শতাংশ স্থগিত হয়ে আছে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ না হওয়ায় এর সঠিক পরিমাণ বলা কঠিন।’

 

এই সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা রপ্তানি বাজারে টিকে থাকার জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

শাকসবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান লী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসাইন বলেন, ‘আমরা ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে শাকসবজি রপ্তানি করি। কিন্তু যুদ্ধের কারণে আমাদের রপ্তানি ব্যবসায় কার্যত ধস নেমেছে। বলতে গেলে এখন রপ্তানি প্রায় বন্ধ—যেটুকু হচ্ছে, তা উল্লেখ করার মতো কোনো পরিমাণ না।’

তিনি বলেন, আগে যেখানে এয়ার ফ্রেইট খরচ ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এয়ারলাইন্সগুলোকে ঘুরপথে অনেক দূর দিয়ে ইউরোপে যেতে হচ্ছে, ফলে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

Manual7 Ad Code

বাজার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে আবুল হোসাইন বলেন, ইউরোপের বাজারে এখন আমাদের পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। ডোমিনিকানসহ বিভিন্ন দেশ এবং আফ্রিকার দেশগুলো থেকে অনেক কম দামে শাকসবজি ইউরোপে প্রবেশ করছে। ফলে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগে যেখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কন্টেইনার এবং সপ্তাহে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ কন্টেইনার পণ্য রপ্তানি হতো, এখন সেখানে পুরো সপ্তাহে মাত্র ৩ থেকে ৫ কন্টেইনার পণ্য যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে কার্যত রপ্তানি বন্ধের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।

রপ্তানিকারকরা জানান, যুদ্ধের কারণে আমদানিকারকরা এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। অনেকেই নতুন অর্ডার দিচ্ছেন না, আবার কেউ কেউ আগের অর্ডারও স্থগিত করেছেন।

বেড়েছে শিপিং খরচ ও লিড টাইম

Manual3 Ad Code

বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করছে। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন সময় ১০-১৪ দিন পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্ডার কমার পাশাপাশি খরচ বাড়ছে—এই দ্বৈত চাপ শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক।

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, আমাদের প্রতিযোগিতা মূলত সময় ও খরচের ওপর নির্ভরশীল। লিড টাইম বাড়লে ক্রেতারা সহজেই বিকল্প উৎসে চলে যেতে পারে।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, যা ভোক্তা চাহিদাকে সংকুচিত করতে পারে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু সরবরাহ নয়, বৈশ্বিক চাহিদাও কমে যাবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, বলে আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

তাদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের একটি বড় দুর্বলতা হলো—মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক শিপিং রুট ও জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এছাড়া সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য ও বাজার কেন্দ্রীকরণও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশই যুদ্ধের প্রভাব বহন করছে। কারণ এই সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ছায়া ফেলেছে এবং জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশও নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যা যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশকে জ্বালানি ও শক্তির সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি, যুদ্ধের প্রভাব কমিয়ে আনা এবং অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবসা সচল রাখতে বর্তমান কৌশল পুনর্বিন্যাস করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা বলেন, সামগ্রিকভাবে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করেছে। নীতি-নির্ধারকদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিকল্প বাজার ও রুট তৈরি, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং রপ্তানি খাতকে বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলা করা।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code