দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনালের উদ্বোধন পিছিয়ে যাচ্ছে বার বার। জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের উদ্বোধন পিছিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে সমন্বয়হীনতা ও দরকষাকষির ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন অনেকে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চালুর জন্য ‘প্রস্তুত অবস্থায়’ থাকলেও অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় থার্ড টার্মিনালের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আটকে আছে। বেবিচক কর্তৃপক্ষ টার্মিনাল উদ্বোধনের বিষয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরকে ডেডলাইন হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত জাপানি অপারেটরের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় টার্মিনাল চালুর বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়।
সর্বশেষ সোমবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন শেষে ডিসিদের বিমান ও পর্যটন খাতসংক্রান্ত দিকনির্দেশনা তুলে ধরতে গিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে। তিনি বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল চালু করতে পারব বলে আশা করছি।’
Manual4 Ad Code
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর এ প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকটা থমকে ছিল। তবে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে এই টার্মিনালটি দ্রুত চালুর নির্দেশ দেন। এ নির্দেশনার পর নির্মাণকাজে কিছুটা গতি এলেও এটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত থার্ড টার্মিনালের অপারেটর নিয়োগ দিতে ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। দফায় দফায় বৈঠক হলেও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারও একাধিক বৈঠক করে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে। কিন্তু ঐকমত্য না হওয়ায় তারাও থার্ড টার্মিনালে অপারেটর নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়।
জানা যায়, গত মার্চ ও চলতি এপ্রিল মাসে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যদিও আয় বণ্টনসহ বেশকিছু ইস্যুতে এখনও চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি দুই পক্ষ। এতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাসহ একাধিক মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ আয় বণ্টন নিয়ে সরকারের সঙ্গে জাপানি কর্তৃপক্ষের কোনো চুক্তিতে না পৌঁছনোর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় সরকারের সঙ্গে জাপানি কর্তৃপক্ষের চুক্তি নির্ধারিত না হলে থার্ড টার্মিনাল অপারেশন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘চুক্তি হলেও ন্যূনতম ৬ মাস সময় লাগবে; কারণ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য যে কোম্পানিকে নিযুক্ত করা হবে, তারা চুক্তির পরপরই টার্মিনালে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না।’ এ বিষয়ে জানতে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রীর মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিয়ে ও মেসেজ পাঠিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত, গত ২৭ এপ্রিল বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক গণমাধ্যমকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণকাজ শেষ অনেক আগেই। আগামী ১২ মাসের মধ্যে অপারেশনাল কার্যক্রমে আসবে।
বেবিচক সূত্রে জানা যায়, থার্ড টার্মিনাল গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনায় বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে আরেকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করবে।
Manual6 Ad Code
জানা যায়, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়ে বেবিচক এবং জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে আয় বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের কারণে কয়েক বছর ধরে তৃতীয় টার্মিনালটি অচল পড়ে ছিল। শিল্প খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এর কারণ হিসেবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতাকে দায়ী করেছেন, যার ফলে রাষ্ট্রীয় এই বিশাল সম্পদটি অলস পড়ে ছিল।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের নেতৃত্বাধীন জাপানি কনসোর্টিয়ামকে একটি সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এ বিষয়ে ১৩ মার্চ প্রথম বৈঠকে টার্মিনাল থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ১৮ শতাংশ বাংলাদেশকে দেওয়ার প্রস্তাব করে জাপানের কনসোর্টিয়াম। তবে কনসোর্টিয়ামকে তাদের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। বেবিচক সূত্রে জানা যায়, দ্বিতীয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রস্তাব অনুযায়ী জাপানি কনসোর্টিয়াম ১৫ বছরের জন্য থার্ড টার্মিনালে অপারেটর হিসেবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫৯ দশমিক ৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এবং টার্মিনাল থেকে উপার্জিত আয়ের সাড়ে ২২ শতাংশ বাংলাদেশকে দেওয়া হবে। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
২৯ এপ্রিল সরেজমিন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় নির্মাণ শেষ হওয়া অত্যাধুনিক এই টার্মিনাল ‘নীরব’ দাঁড়িয়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিতরা টার্মিনাল এলাকা নজরদারি করছেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুয়েকজনের যাতায়াত লক্ষ করা গেছে। যদিও তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে একাধিক নিরাপত্তাকর্মী এই প্রতিবেদককে জানান, ওপর মহল থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বরে থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনের কথা বলা হয়েছে। আরেকজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, ‘প্রায় ২ বছর হয়েছে এ টার্মিনালের সব কাজ শেষ। আমাদেরও এই নীরবতা ভালো লাগে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মূলত সরকার পরিবর্তনের পর ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য অর্জনে জটিলতা দেখা দেয়।’ এ বিষয়ে কনসোর্টিয়ামের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত আর্থিক মডেল নিয়ে মূল মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে আয়-ব্যয়ের প্রস্তাবিত কাঠামোর সঙ্গে বেবিচক একমত হতে পারছে না বলে তিনি জানান।