অনেক উত্থান-পতনের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হলো চার দিন আগে। ২৫ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে দেশের ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তুমুল বিতর্ক দেখল দেশবাসী। এসব ইস্যুতে সরকারি দল ও বিরোধী দল একে অপরকে ছেড়ে কথা বলেনি। আবার জ্বালানিসংকটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন আলোচনায় এল, তখন সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখা গেল উভয় পক্ষকে। সব মিলিয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সংসদবিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অধিকাংশ সংসদ সদস্য নতুন হওয়ার পরও মোটের ওপর তাঁদের কর্মকাণ্ড ভালো। তাঁরা শিখছেন। বিশেষ করে সরকারি ও বিরোধী দলের সমঝোতার কিছু জিনিস দেখা যাচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি ও বিরোধী দল তর্ক-বিতর্ক করবে। আবার বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতায় আসবে। এটা ভালো লক্ষণ।’
Manual3 Ad Code
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার পদে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার পদে কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী প্রথম দিন ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল।
এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা বিল পাসসহ নানা বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যুক্তিতর্ক হয়েছে। যদিও আইন প্রণয়ন, প্রতিনিধিত্ব এবং তদারকির বিষয়গুলো আশানুরূপ নয় বলে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ সদস্যের অনভিজ্ঞতাকে মোটাদাগে দায়ী করছেন তাঁরা।
অধিবেশনের প্রথম দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়; যার মধ্যে ৯৮টি হুবহু, ১৫টি সংশোধনী আকারে এবং ৪টি রহিতকরণের জন্য সংসদে বিল পাসের জন্য উত্থাপনের সুপারিশ করে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ ল্যাপস করার সুপারিশ করে কমিটি। শেষ পর্যন্ত ৯১টি বিলের মাধ্যমে ১১৭টি অধ্যাদেশের সমাধান করা হয়; যার মধ্যে ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু, ১৩টি সংশোধনীসহ এবং সাতটি রহিত করা হয়। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের সময়ে সংশোধিত তিনটি বিল পাস হয়। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করে করে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩ সংশোধন বিল’ পাস হয় আলোচনা ছাড়া।
Manual6 Ad Code
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর প্রায় ৪০ ঘণ্টার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য।
নিকট অতীতে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে যে সম্পর্ক দেখা যেত, এবার তার কিছুটা ব্যতিক্রম দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, সেখানে সহযোগিতা এবং সংঘাতময় সম্পর্ক সামনে এসেছে। জ্বালানিসংকট নিয়ে আলোচনার পর দুই পক্ষের সমন্বয়ে কমিটি গঠনকে সহযোগিতার প্রকাশ বলে মনে হয়েছে। তবে কতগুলো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা গেছে। এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই পক্ষ যেন ভিন্ন মেরুতে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদে ৩০০ জনের ২৯৮ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন; যাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ ২২০ জনই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
প্রথম অধিবেশনের বড় অংশই গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর সুরাহা করতে। এসব অধ্যাদেশ যখন বিল আকারে সংসদে তোলা হচ্ছিল, তখন কয়েকটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি জানাতে। কিন্তু স্পিকারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, বিরোধী দল সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি মেনে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ নেয়নি। তাই তাদের আপত্তি ধোপে টেকেনি। যদিও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, বিলগুলো উত্থাপনের আগে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে টেবিলে সরবরাহ করা হচ্ছে না।
সংসদের অধিকাংশ সদস্য নতুন হওয়ায় প্রাথমিকভাবে কিছু ভুলভ্রান্তি হচ্ছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, বিষয়টি সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাও স্বীকার করছেন। তবে সংসদ সদস্যরা সংসদীয় রীতিনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
Manual4 Ad Code
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাইফুল আলম মিলন বলেন, ‘অভিজ্ঞতা না থাকায় কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণে কিছুটা ঘাটতি থাকার আছে। ঘাটতি থাকতে পারে, অসুবিধা কী? আমি হয়তো ১০০ বুঝতে না পারি, কিন্তু ৫ বুঝতে পারি, সে সুযোগটা দিতে হবে।’
তবে সংসদ নিয়ে মানুষের আশা পূরণ হয়েছে বলে দাবি সরকারদলীয় হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানের। তিনি বলেন, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদে দেওয়া সব সদস্যের বক্তব্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন। আমজনতা, বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করেন। তাহলে বোঝা যাবে, সংসদ নিয়ে মানুষের আশা পূরণ হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যের অনেক অংশই নতুন। তাঁদের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা জরুরি। সংসদে দেশের প্রধান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হবে, সেটাই জনগণের প্রত্যাশা। জনগণ মনে করে, সংসদ যেন অতীতের মতো নির্বাহী বিভাগের রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত না হয়।