দেশে প্রতি বছর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে বের হচ্ছেন লাখো তরুণ। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ কর্মজীবনে গিয়ে বুঝতে পারছেন, শুধু সনদ দিয়ে কাজ হচ্ছে না। শিল্প-কারখানা, প্রযুক্তি খাত, নির্মাণ শিল্প কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সবখানেই এখন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে।
অথচ বাংলাদেশ এখনও দক্ষ জনশক্তি তৈরির বদলে মূলত সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি।
এর মধ্যে উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৫০ থেকে ৫৫ লাখ। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পড়াশোনা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে- প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ।
অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ এখনও খুব সীমিত। সাধারণ শিক্ষা ধারায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যুক্ত হলেও তাদের বড় অংশ চাকরিবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে কাজ করতে যান। কিন্তু তাদের বড় অংশ অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রমিক। ফলে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্যান্য শ্রমবাজারে কম মজুরির কাজ করতে বাধ্য হন।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কা শিল্প-উপযোগী দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে। সেই উপলব্ধিই তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
দেশেও এখন সেই বাস্তবতা সামনে এসেছে। জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশে যেমন বেকারত্ব বাড়ছে, তেমনি বিদেশে গিয়েও অধিকাংশ শ্রমিক নিম্নআয়ের কাজ করছেন।
চীন (৪০-৪৩ শতাংশ) উৎপাদন শিল্পভিত্তিক দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে। সিঙ্গাপুর (৪২ শতাংশ) উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি নিশ্চিত করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া (৩০ শতাংশ) শিল্পায়ন কেন্দ্র করে টেকনিক্যাল শিক্ষা দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর (ইলেকট্রনিক ডিভাইস, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং আধুনিক প্রযুক্তির মূল উপাদান হিসেবে কাজ করা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, মাইক্রোচিপ এবং অন্যান্য সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ) এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
Manual1 Ad Code
জাপান (২৫-৩০ শতাংশ) স্কুল ও শিল্পের সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অটোমোবাইল ও প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ (১৪-১৮ শতাংশ) কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। সীমিত অবকাঠামো ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাবে কারিগরি শিক্ষা পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা শেষে দেশে নতুন করে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ শিক্ষিত বেকার, যারা ১০ বছরের মাধ্যমিক ও দুই বছরের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে লেখাপড়া করেও সমাজে অনুৎপাদনশীল হয়ে দেশের অর্থনীতিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছেন না।
বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি দেশে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। আর এ জন্য দেশের পুঁথিগত শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। অন্যদিকে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দাঁড়াবে ৮ কোটি ৪৮ লাখ দক্ষ শ্রমিকের।
এ বিপুলসংখ্যক জনশক্তি দক্ষ করে গড়ে তোলাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৃত্তিমূলক জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। এতে বাস্তব জীবনে পুঁথিগত জ্ঞান কাজে আসে না।
লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্য মতে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি ১০ জন শিক্ষিত তরুণের তিনজন বেকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক প্রকৌশলীদের হার ১৪ দশমিক ২৭ তাংশ। নারী চিকিৎসক প্রকৌশলীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ।
এরপরই আছেন উচ্চ মাধ্যমিক ডিগ্রিধারীরা। তাদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০টি সর্বাধিক বেকারত্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ।
বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক (গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স) অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর হলো এশিয়ার সবচেয়ে ইনোভেটিভ (উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন) দেশ। কয়েক বছর ধরে সিঙ্গাপুর ধারাবাহিকভাবে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে।
২০২৪ সালের সূচকে, সুইজারল্যান্ডের অবস্থান ছিল বিশ্বে প্রথম। দ্বিতীয় স্থানে সুইডেন। সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়া মহাদেশে প্রথম। ১৯ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৩টি দেশের মধ্যে ১০৬। আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া বস্তুত সব দেশই সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে।
শ্রীলঙ্কা (৮৯) কিংবা সেনেগালও (৯২) সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। সূচকে ভারতের অবস্থান ৩৮ এবং চীনের অবস্থান ১১। প্রতি মিলিয়ন (১০ লাখ) মানুষের মধ্যে কতজন গবেষক ও উদ্ভাবক আছে, সে বিবেচনায় ইউরোপের অনেক দেশ চীন থেকে এগিয়ে। যেমন সুইডেনে প্রতি মিলিয়নে প্রায় ৯ হাজার গবেষক ও বিজ্ঞানী পাওয়া যায়।
দেশের একটি বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেও দক্ষতার অভাবে তারা কাক্সিক্ষত আয় করতে পারছে না। দক্ষতার অভাবে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকের একটি বড় অংশই অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ, যার ফলে দেশ রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে।
একজন অদক্ষ শ্রমিকের মাসিক গড় আয় যেখানে ২৫-৪০ হাজার টাকা, সেখানে একজন দক্ষ টেকনিক্যাল কর্মীর আয় ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার বেশি হতে পারে। দেশে কারিগরি শিক্ষাকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা’ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অভিভাবকদের মধ্যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়মুখী মানসিকতা কাজ করে। শিক্ষাক্রমে শিল্প-কারখানার সঙ্গে সংযোগহীনতা রয়েছে।
বর্তমান পাঠ্যক্রম চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি নয় এবং এটি মূলত সনদ বা সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক। দেশের সাধারণ ধারার শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম।
এর বিপরীতে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়া সত্ত্বেও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেশি। বিশাল জনগোষ্ঠী জনসম্পদে রূপান্তর করতে চায়, তবে দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষানীতি গ্রহণ করা জরুরি।
বিশেষ করে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধিতে অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ টেকনিক্যাল কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কর্মসংস্থানের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হলে আমাদের মুখস্থ বিদ্যা এবং সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরিরও প্রধান নিয়ামক। ফলে উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্প খাতের চাহিদাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী বের হয়। উচ্চশিক্ষা নিয়েও অনেককে বেকার থাকতে হয়। অর্থাৎ বেকারত্বের সংখ্যা উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেশি। এর কারণ সম্পর্কে নানা মত রয়েছে।
তবে এ ব্যাপারে অনেকেই একমত, একাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশির অন্যতম কারণ।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে দক্ষ শ্রমিকের হার এখনও খুব কম। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এখন দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
রেমিট্যান্স অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব রয়েছে। দক্ষ কর্মীরা যেখানে বেশি আয় করতে পারেন, সেখানে অদক্ষ শ্রমিকদের আয় খুব সীমিত। বিশ্বব্যাংক, আইএলও ও ইউনেসকোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দশকের অর্থনীতি হবে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি।
Manual4 Ad Code
যে দেশ দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারবে, সেই দেশই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে। এ কারণেই এশিয়ার বহু দেশ কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার সবচেয়ে বড় বাধা সামাজিক মানসিকতা। এখনও অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে ‘কম মেধাবীদের শিক্ষা’ হিসেবে দেখে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে সাধারণ শিক্ষা ধারায় যায়, যদিও চাকরির বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।
দ্বিতীয়ত অবকাঠামোগত দুর্বলতা বড় সমস্যা। বহু টেকনিক্যাল স্কুল ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আধুনিক ল্যাব, যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ সুবিধা নেই। তৃতীয়ত শিল্প-কারখানার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ খুব দুর্বল।
ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব শিল্প পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা না নিয়েই সনদ অর্জন করছে। দক্ষ প্রশিক্ষকের সংকটও গুরুতর। অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ শিক্ষক নেই। ফলে পুরোনো পাঠ্যক্রম দিয়েই প্রশিক্ষণ চলছে। নীতিগত দুর্বলতাও রয়েছে।
বাংলাদেশে বহু সময় প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা কম। কিছু ক্ষেত্রে সনদ বাণিজ্য ও নিম্নমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভিযোগও রয়েছে। এতে পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
Manual6 Ad Code
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, চাকরিবাজারের চাহিদা ও শিক্ষাক্রমের মধ্যে বড় ফারাক। বিশ্ব যখন এআই, রোবটিক্স, অটোমেশন, সাইবার সিকিউরিটি ও উন্নত প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠান এখনও পুরোনো ধাঁচের কোর্স চালাচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ছিল বিধ্বস্ত একটি দেশ। শিল্প-কারখানা ধ্বংস, অর্থনীতি বিপর্যস্ত। কিন্তু দেশটি খুব দ্রুত বুঝতে পারে, পুনর্গঠনের প্রধান শক্তি হবে দক্ষ মানবসম্পদ। তাই জাপান স্কুলপর্যায় থেকেই প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে যুক্ত করে। শিল্প-কারখানার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়।
‘লার্ন অ্যান্ড ওয়ার্ক’ মডেলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব শিল্প পরিবেশে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। জাপানের অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স ও ভারী শিল্প খাতের পেছনে এই দক্ষ কর্মশক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে। টয়োটা, হিটাচি কিংবা মিতসুবিশির মতো শিল্পগোষ্ঠী নিজস্ব প্রশিক্ষণব্যবস্থাও গড়ে তোলে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গল্পও প্রায় একই রকম। ষাট দশকে দেশটি ছিল দরিদ্র ও কৃষিনির্ভর। কিন্তু সরকার শিল্পায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকনিক্যাল স্কুল, পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বুঝেছিল, শিল্পের জন্য দক্ষ শ্রমিক তৈরি না করতে পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষানীতি সরাসরি শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বর্তমানে দেশটির সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইল ও প্রযুক্তি শিল্পের পেছনে রয়েছে সেই দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনা।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনার বাইরে থাকে চীনের বিশাল কারিগরি শিক্ষা নেটওয়ার্ক। চীন উৎপাদন শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে লাখো তরুণকে ভোকেশনাল শিক্ষায় যুক্ত করেছে।
দেশটিতে মাধ্যমিক স্তরের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ধারায় যায়। চীনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি শিল্পাঞ্চল ও উৎপাদন খাতের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স তৈরি করা হয়। ফলে শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করেই উৎপাদন খাতে কাজ করতে পারে।
চীনের ‘মেড ইন চায়না’ নীতির পেছনে দক্ষ টেকনিশিয়ান, মেশিন অপারেটর, ইলেকট্রনিক্স বিশেষজ্ঞ ও কারখানা ব্যবস্থাপক তৈরির এ পরিকল্পনা বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষা যে কত গুরুত্বপূর্ণ, চীন তার বড় উদাহরণ।
সিঙ্গাপুর বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত কারিগরি শিক্ষা মডেলগুলোর একটি তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুরে কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা মনে করা হয় না বরং প্রযুক্তি, প্রকৌশল, ডিজিটাল সেবা, হসপিটালিটি, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষতা অর্জনকে মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্কিল ফিউচার কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের সারাজীবন দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। চাকরিতে থাকা ব্যক্তিরাও নতুন দক্ষতা অর্জনের জন্য সরকারি সহায়তা পান। ফলে সিঙ্গাপুর দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখতে পেরেছে।
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশগুলোর একটি। ভারত তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল, নির্মাণ শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও টেলিকম খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে কিছুটা সফল হয়েছে।
বিশেষ করে আইটি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ ভারতের বৈদেশিক আয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তবে ভারতের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রশিক্ষণের মান বৈষম্য, গ্রামীণ অঞ্চলে অবকাঠামোর ঘাটতি এবং চাকরির সঙ্গে প্রশিক্ষণের সমন্বয়হীনতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
শ্রীলঙ্কা তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশ হলেও বিদেশমুখী দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে তারা পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। দেশটি নার্সিং, কেয়ারগিভিং, হসপিটালিটি, নির্মাণ ও সামুদ্রিক খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে।
ফলে শ্রীলঙ্কার প্রবাসী শ্রমিকদের আয় তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারে দেশটির দক্ষ কর্মীদের চাহিদাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ যেখানে এখনও বিপুলসংখ্যক অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠায়, সেখানে শ্রীলঙ্কা দক্ষতা দিয়ে শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষায় ভালো ফোকাস দিয়েছে। তবে তা অপ্রতুল।
সরকারের পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে সন্তানকে বিএ, এমএ পাস করাতে হবে। কিন্তু দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে।
তবে শিক্ষা বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অদক্ষ জনশক্তি বাড়ছে এবং তা দেশে ও দেশের বাইরে কাজে লাগছে না। এরা দেশের জন্য শিক্ষিত বেকার হিসেবে বোঝা বাড়াচ্ছে।