পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের কুরবানির পশুর বাজারে বিপুল সরবরাহ থাকছে। সরকারি হিসাব বলছে, সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় বাজারে ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। তবু দামে স্বস্তি মিলবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন খামারি ও বাজার-সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, গোখাদ্য, পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও খামার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পশুর দাম কমানোর সুযোগ নেই। ফলে হাটে পশুর প্রাচুর্য থাকলেও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কুরবানির হিসাব এবারও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকাসহ সারা দেশের পশুর হাটগুলোতে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তুঙ্গে। রাজধানীর গাবতলী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ হাট সর্বত্রই সাজ সাজ রব। কোথাও খামারিরা তাদের পরম মমতায় লালনপালন করা পশু নিয়ে হাটে উঠার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আবার কোথাও চলছে শেষ সময়ের নিবিড় পরিচর্যা ও সাজসজ্জা।
Manual7 Ad Code
তবে এবারের বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে ক্রেতাদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারই বিশাল আকারের গরুর পরিবর্তে মাঝারি বা সাশ্রয়ী গরুর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত কুরবানির চেয়ে অংশীদারত্ব বা যৌথ কুরবানির প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
কয়েক দিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ জানিয়েছেন, এ বছর কুরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। বর্তমানে দেশে কুরবানিযোগ্য পশুর মোট সরবরাহ রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু। ফলে চাহিদার তুলনায় এবার বাজারে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
Manual2 Ad Code
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এ বছর কুরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে দেশে কুরবানির পশুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ২০১৫ সালে যেখানে ৮৫ থেকে ৮৮ লাখ পশু কুরবানি হয়েছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখে।
গত এক দশকে দেশের কুরবানির বাজার শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি এখন রূপ নিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এক মৌসুমি অর্থনীতিতে। প্রাণিসম্পদ খাতের এই বিশাল প্রাপ্যতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, আগে যেখানে কুরবানির বাজারের একটি বড় অংশ ভারতীয় পশুর ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন দেশীয় ছোট ও মাঝারি খামারিদের উৎপাদিত পশু দিয়েই বাজারের শতভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
সংশিষ্টরা জানান, কুরবানির হাট শুধু পশু বেচাকেনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। পশুখাদ্য হিসেবে খৈল, ভুসি, ভুট্টা ও খড়ের বাজার এই সময়ে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এ ছাড়া পশুবাহী ট্রাকের পরিবহন খাত, হাটের ইজারা, অস্থায়ী শ্রমবাজার, দা-ছুরি তৈরির কামারশালা এবং লবণের বাজারও এই অর্থনীতির অংশ। এ ছাড়া চামড়া শিল্পের জন্যও এটি বছরের সবচেয়ে বড় মৌসুম।
Manual6 Ad Code
এ বছর পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সাধারণ ক্রেতা ও খামারিরা এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গোখাদ্য, ভুসি, খড় এবং শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
রাজধানীর একটি এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম জানান, গোখাদ্যের দাম ও খামারের দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। যার প্রভাব পড়বে কুরবানির পশুর দামের ওপর। ফলে এই ঈদে কুরবানির পশুর সরবরাহ বাড়লেও দাম কমার সম্ভাবনা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের খামারি মো. ইব্রাহিম জানান, খড়, খৈল ও ভুসিসহ সব ধরনের পশুখাদ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। পশু লালনপালন করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কুরবানির হাটে পশুর ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসান গুনতে হবে। ভালো দাম না পেলে খামার বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
তবে কুরবানির বাজার ব্যবস্থাপনা ও খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এ বছর সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী পশুর হাটগুলো বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে অবৈধভাবে বিদেশি পশু ঢুকে দেশীয় খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে এ বছর ৩ হাজার ৬০০টিরও বেশি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টিসহ মোট ২৭টি হাট বসছে। এসব হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সহায়তায় ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকবে।
এ ছাড়া অনলাইনে পশু বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘হাসিল’ বা খাজনা দিতে হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি জানিয়েছেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং প্রয়োজনে সাদা পোশাকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এ বছরও অনলাইনে পশু বিক্রির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।