প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ওয়ান ইলেভেন-এর অন্দরমহল নিয়ে প্রত্যক্ষ বয়ান

editor
প্রকাশিত মে ১৪, ২০২৬, ০১:০১ অপরাহ্ণ
ওয়ান ইলেভেন-এর অন্দরমহল নিয়ে প্রত্যক্ষ বয়ান

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। ওয়ান ইলেভেন নামে বহুল পরিচিত দিনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুবই ঘটনাবহুল, আলোচিত ও সমালোচিত। ওয়ান ইলেভেন অধ্যায়কে ঘিরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম কথা জানা গেছে।

ঘটনাবহুল ওই ওয়ান ইলেভেনের দিন রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনের অন্দরমহলে আসলেই সেদিন কী ঘটেছিল, কেমন ছিল ওয়ান ইলেভেনের আগে-পরের পরিস্থিতি। সেদিনের ঘটনা সশরীরে উপস্থিত থেকে সবকিছু দেখেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রতি ও প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহমেদের প্রেস সচিব ও উপদেষ্টা এম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। একান্ত সাক্ষাৎকারে মোখলেসুর রহমান ওয়ান ইলেভেন ও এর পূর্বাপর ঘটনাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

মোখলেসুর রহমানের ভাষ্যে দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি পাল্টে দেওয়া এই ঘটনার মূল খলনায়ক ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ। নিজের দুরভিসন্ধি হাসিল করতে তিনি এমন কোনো কূটকৌশল নেই যা করেননি। তিনি চেয়েছিলেন দেশে মার্শাল ল’ জারি করে নিজে রাষ্ট্রপতির আসনে বসতে। এ জন্য তিনি একদিকে যেমন ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র ছক এঁকেছিলেন, অন্যদিকে কখনো ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে, কখনো পাকিস্তনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে নানারকম তৎপরতা চালিয়েছেন। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা তিনি ঘটিয়েছিলেন ওয়ান ইলেভেনের দিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে এক রকম জিম্মি করে জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে দেশকে মহা সংকটের দিকে ঠেলে দিয়ে।

মোখলেসুর রহমান জানান, ওয়ান ইলেভেনের খলনায়ক জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ যখন তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে নানাভাবে তার কাছ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলেন তখন তাকেও প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতি করার। তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেন একদিনে হুট করে ঘটেনি। ওয়ান ইলেভেনের বিষয়ে বলতে গেলে তার প্রেক্ষাপটটাও আগে বলতে হবে। ২০০১ সালে টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন ও বিভিন্ন আন্দোলন শুরু করে। ২০০৪ সালে আ.লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সরকারকে ফেলে দেওয়ার ডেটলাইন দিয়েছিলেন।

এরপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের মতো ঘটনায় রাজনীতিতে অবিশ্বাস বাড়ে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ‘লগি-বৈঠা’র মাধ্যমে যে সহিংসতা ও মরদেহের ওপর নৃত্যের ঘটনা ঘটে, জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ সেটাকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপট তৈরি করেন।

২৯ অক্টোবরের বৈঠক ও জরুরি অবস্থা ঠেকানো : মোখলেসুর রহমান বলেন, ২৯ অক্টোবর রাতে বিদায়ি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। সেখানে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের প্রস্তুত করা জরুরি অবস্থা জারির কাগজপত্র নিয়ে আলোচনা হয়। তখন আমি এর বিরোধিতা করি এবং বলি যে, জরুরি অবস্থা ছাড়াই সিভিল পাওয়ারে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। জেনারেল মঈন আমার মত গ্রহণ করলেন না। আমি তখন বুঝতে পারছিলাম তার ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে।

ওয়ান ইলেভেনের দিনে যা ঘটেছিল : মোখলেসুর রহমান বলেন, ওই দিন সকালে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে বঙ্গভবনে আসেন। তিনি জাতিসংঘ থেকে শান্তিরক্ষা মিশন বাতিলের একটি ভুয়া চিঠির ভয় দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। সেনাবাহিনী বঙ্গভবন দখল করে ফেলে এবং রাষ্ট্রপতিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাঁজাকোলার মতো করে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সস‍্যদের নামে কথিত দুর্নীতির কথা বলে এবং চাপে ফেলে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করা হলেও তিনি স্বল্প সময়ের জন্য নয়, ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তার বিষয়ে আর আলোচনা এগোয়নি। পরে তিনিই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নাম প্রস্তাব করেন এবং তাকেই প্রধান উপদেষ্টা করা হয়।

মোখলেসুর রহমান বলেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সকালে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ ৯টার দিকে ক্যান্টনমেন্টে তার অফিসে যান। তিনি বাকি দুই বাহিনী প্রধানকে ফোন করে ডেকে নিয়ে আসেন তার অফিসে। মঈন ইউ আহমেদ তখন তাদের জানান, জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী প্রতিনিধি তাকে একটি চিঠি দিয়েছেন এবং সেই চিঠিতে তিনি বলেছেন, চিঠির মধ্যে বলা আছে সব দলকে নিয়ে নির্বাচন না করলে এবং সেই নির্বাচনে যদি সেনাবাহিনী সহায়তা করে তা হলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের যে সেনাবাহিনী অংশগ্রহণ করছে তাদের এখান থেকে বহিষ্কার করা হবে।

জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধির এই চিঠির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আতঙ্কের সৃষ্টি করেন। এই চিঠির কথা বলে তাদের বঙ্গভবনে যেতে বলেন। তখনকার বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল ফখরুল আজম বলেন, রাষ্ট্রপতি না ডাকলে আমরা বঙ্গভবনে যেতে পারি না। তার এ বক্তব্যের পর জেনারেল মঈন বলেন, হ্যাঁ, আপনাদের স্যার ডাকবে। এরপরে তিনি বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে ফোন করালেন। ফোন করে বললেন যে, রাষ্ট্রপতি ডেকেছেন। তখন আমরা সকালে বঙ্গভবনে একটা উচ্চ আইনশৃঙ্খলা উচ্চ পর্যায়ের একটা মিটিংয়ে ছিলাম।

পিএস ও সেনা অফিসার লেফটেন্যান্ট মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সেখানে বসেছিলেন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারীও ওখানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ওই মিটিংয়ে পুলিশের আইজি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা অংশগ্রহণ করেন। সেই মিটিংয়ে থাকা অবস্থায় বঙ্গভবনের দায়িত্বরত একজন অফিসার এসে রাষ্ট্রপতিকে বললেন, তিন বাহিনীর প্রধানরা আসছেন। আমি তখন বললাম, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি না ডাকলে তো তারা আসতে পারেন না। রাষ্ট্রপতি না ডাকলে তো তাদের আসতেও দেওয়া যাবে না। কিছুক্ষণ পরেই সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে তিন বাহিনীর প্রধানরা এলেন। আসার পরে সেখানে আমরা প্রথমে ঢুকতে বাধা দিলাম এবং ওখানে যে পিজিআরের কমান্ড্যান্ট ছিলেন তিনি আমার রুমে এলেন।

আমি তখন রাষ্ট্রপতিকে খাবারের ও ইনসুলিনের কথা বলে ডাইনিং রুম নিয়ে গেলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা রাষ্ট্রপতিকে অনেকটা ‘পাঁজাকোলা’ করে বা জোরপূর্বক তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভেতরের রুমে নিয়ে একটি চেয়ারে বসিয়েছিল। রাষ্ট্রপতির রুমের দরজার ঠিক বাইরে একজন সামরিক অফিসারকে চেয়ার দিয়ে পাহারায় বসিয়ে দেওয়া হয়। জেনারেল মঈন আহমেদ তখন অত্যন্ত উত্তেজিত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতিকে ভয় দেখানোর জন্য বারবার বলছিলেন যে জেনারেল মাসুদ ট্যাঙ্ক নিয়ে আসছেন। পুরো বঙ্গভবন তখন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক ভীতিকর এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে রূপ নিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারকে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে ও চাপে ফেলে মূলত সেই বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। এভাবে তারা জোর করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করেছিল। আমি মনে করি ওয়ান ইলেভেন বাংলাদেশে দুর্নীতি, গুম ও খুনের সংস্কৃতির সূচনা করেছে এবং একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পথ প্রশস্ত করেছে।

সমঝোতার লক্ষ্য ও প্রেক্ষাপট : জেনারেল মঈন আহমেদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে সরাসরি বা দীর্ঘকাল ক্ষমতা দখল করে রাখা সম্ভব নয়, তখন তিনি একটি ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি দুই নেত্রীর সঙ্গেই সমঝোতার চেষ্টা করেন।

Manual5 Ad Code

দুই নেত্রীর অবস্থান : জেনারেল মঈন তার ঘনিষ্ঠ কিছু অফিসারের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন যে নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে যেন মঈন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। বেগম জিয়া এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে ভোটের মাধ্যমে জয়ী হওয়ার জন্য তাদের একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ প্রয়োজন ছিল।

Manual7 Ad Code

প্রণব মুখার্জির মধ্যস্থতা : এই সমঝোতায় ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারতের সরকার শুরুতে শেখ হাসিনার কিছু মন্তব্যের কারণে ক্ষুব্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে প্রণব মুখার্জি জেনারেল মঈন এবং শেখ হাসিনার মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা নিশ্চিত করেন। প্রণব মুখার্জি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে সক্ষম হন যে মঈন সরকার ব্যর্থ হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, যা তাদের কাম্য ছিল না।

নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাইনাস ফর্মুলা : মোখলেসুর রহমান বলেন, ওয়ান ইলেভেনের মূল লক্ষ্য ছিল জেনারেল মঈন আহমেদের রাষ্ট্রপতি হওয়া। তিনি ‘মাইনাস ফর্মুলা’র মাধ্যমে দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য একটি ছক সাজানো হয়। জেনারেল মঈন ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার একটি সমঝোতা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৯ ডিসেম্বর নজিরবিহীন কারচুপি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সিট ভাগাভাগি করা হয়, যেখানে বিএনপিকে মাত্র ৩০টি সিট দেওয়া হয়।

সমঝোতার প্রেক্ষাপট ও ভারতের অবস্থান : মোখলেসুর রহমান বলেন, শুরুর দিকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ শেখ হাসিনার কিছু ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট দিলে ভারত সরকার তার ওপর কিছুটা নাখোশ ছিল এবং সাময়িকভাবে জেনারেল মঈনকে সমর্থন দিচ্ছিল, কিন্তু বাংলাদেশে ছাত্র, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীদের আন্দোলন তীব্র হলে এবং মঈন সরকার ব্যর্থ হতে শুরু করলে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করে। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এই সমঝোতায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তিনি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, মঈন সরকার টিকতে না পারলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, যা ভারতের জন্য কাম্য ছিল না। তাই তিনি জেনারেল মঈনের সেফ এক্সিট এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার পথ সুগম করতে একটি সমঝোতা তৈরি করেন।

জেনারেল মঈনের লক্ষ্য : জেনারেল মঈন মূলত নিজের জন্য একটি নিরাপদ প্রস্থান বা সেফ এক্সিট খুঁজছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যারা পরবর্তী সময়ে তার এবং তার সহযোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেবে না।

শেখ হাসিনার সম্মতি : শেখ হাসিনা এই সমঝোতাটি গ্রহণ করেছিলেন কারণ তিনি মনে করেছিলেন এটি নির্বাচনের জন্য একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করবে। এর বিপরীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেনারেল মঈনের এ ধরনের কোনো সমঝোতার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

রাজনৈতিক সংস্কার ও বিভাজন : রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ‘সংস্কারপন্থি’ অংশ তৈরি করে দলীয় প্রধানদের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় কিছু সিভিল সোসাইটির সদস্য এবং মিডিয়ার একটি অংশকে ব্যবহার করে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের নামে রাজনীতিবিদদের আটক করা এবং তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। জেনারেল মঈন ও তার অনুসারীরা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে চাপের মুখে রেখেছিলেন।

প্রলোভন ও সমঝোতার প্রস্তাব : জেনারেল মঈন দুই নেত্রীকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, তারা যদি স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান, তবে তাদের সারাজীবন সসম্মানে রাখা হবে এবং সম্মানি ভাতা দেওয়া হবে। এমনকি তিনি তার ঘনিষ্ঠ অফিসারদের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন যে, নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে যেন মঈন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। তবে বেগম জিয়া এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা : জেনারেল মঈন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দাতা সংস্থাগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে দেশ চালানো সম্ভব নয় এবং দুই বছরের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। তিনি বিশেষ করে ভারত ও অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্তরে লবিং করেছিলেন।

মিডিয়াকে ব্যবহার ও চরিত্র হনন : গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (বিশেষ করে ডিজিএফআই) কিছু নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে তথ্য সরবরাহ করত। এই তথ্যগুলোর উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতিবিদদের জনগণের সামনে হেয় করা এবং তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। অনেক পত্রিকা গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত তথ্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের আক্রমণ করত। গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করা সংস্কারপন্থি ও কিছু উপদেষ্টাকে পরবর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে একজন উপদেষ্টাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং অন্য একজনকে রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান বানানো হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংস্কারপন্থি নেতাদের ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়ে এবং মিডিয়া প্রপাগান্ডার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য (মাইনাস ফর্মুলা ও ক্ষমতা সুসংহতকরণ) বাস্তবায়নে ব্যবহার করেছিল।

 

 

 

 

 

 

 

Manual2 Ad Code

 

Manual2 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code