সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভূ-রাজনীতির চক্করে পড়েছে বাংলাদেশ। এক দেশকে ব্লক ইজারা দিলে অন্য দেশ বাংলাদেশ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে সরকারকে এমন বিবেচনা করতে হয়। এতে করে বছরের পর বছর বাংলাদেশের গভীর এবং অগভীর সমুদ্র তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের স্থলভাগে নতুন গ্যাসের মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা নেই। অন্যদিকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গত ২৩ বছরের প্রচেষ্টায় খুব একটা সাফল্য দেখা যায়নি। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্র এলাকার নিকটবর্তী মিয়ানমার এবং ভারত তাদের সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস তুলছে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে। চলতি বছর বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করতে হবে ৫৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিপুল এই ব্যয়ে দেশের অর্থনীতি চাপে পড়ছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির এই চাপ আরও বৃদ্ধি পেলে অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘোচানো কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার অতি সম্প্রতি সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) অনুমোদন করেছে। নতুন পিএসসির আলোকে শিগগিরই সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। তবে এ ধরনের দরপত্র বাংলাদেশে নতুন নয়। দফায় দফায় দরপত্র আহ্বান করেও সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে খুব বেশি সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে দরপত্রের বাইরে গিয়ে যারা তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করতে এসেছে তাদেরও বাংলাদেশ কাজ দিতে পারেনি।
পিএসসি অনুমোদনের পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করবে বাংলাদেশ।
Manual5 Ad Code
পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, নতুন অনুমোদন পাওয়া পিএসসির শর্তে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির (আইওসি) মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর আগে যেসব কাজ করা হয়েছে সেখানে সরকার নিজেদের ইচ্ছার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের পিএসসির বিভিন্ন শর্তকে প্রাধান্য দিয়েছে।
বঙ্গোপসাগর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা বরাবর চোখে পড়ার মতো। সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কোম্পানি এক্সন মবিল বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রে ১৫টি ব্লক ইজারা চেয়ে সরকারকে চিঠি দেয়। সাবেক সরকার এক্সন মবিলকে কাজ না দেওয়ার জন্য নীতিগতভাবে সম্মতি নিয়ে লোক দেখানো একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে।
জ্বালানি বিভাগের সাবেক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, ওই সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে এক বৈঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছে। এই ব্লকগুলো ইজারা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের আগেই ভারত এবং চীন আমাকে ফেলে দেবে।
Manual6 Ad Code
এক্সন মবিল যে ১৫টি ব্লক ইজারা চেয়েছিল তার সব ছিল ভারত এবং মিয়ানমার সীমান্তে। মিয়ানমারের সীমান্ত থেকে চীনের দূরত্ব বেশ কম। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি প্রতিবেশী চীন এবং ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারত। বিশ্ব অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিতে শক্ত অবস্থানে থাকা ভারত এবং চীনকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের জন্য কিছু করে ওঠা খুব সহজ বিষয় না। দেশ দুটি যদি মনে করে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ কোনোভাবে হুমকি তৈরি করবে, তাহলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নানামুখী তৎপরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের জন্য মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র বলছে, ২০২৩ সালের মার্চে এক্সন মবিল বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলাকে সরাসরি চিঠি দিয়ে ১৫টি ব্লক ইজারা চায়। সরকার নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ঝামেলায় যেতে না চাওয়ায় কেবল একটি কমিটি গঠন করে বিষয়টি আলাপ-আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রকৃত ঘটনা জানা কিংবা আওয়ামী লীগের মনোভাব বোঝা খুব কঠিন ছিল না।
Manual7 Ad Code
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, সাবেক সরকার ফ্রান্সের একটি কোম্পানিকে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে একটি প্রাথমিক জরিপ করায়। এজন্য বহুজাতিক কোম্পানি স্ল্যামবার্জার বর্তমান নাম এসএলবিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কোম্পানিটি সারা বিশ্বে অন্তত ১০০টি দেশে কাজ করে। সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান এবং রিজার্ভ বা মজুদ নিরীক্ষণে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এই কোম্পানিটির ভাড়া করা একটি চীনা জাহাজকে ভারতীয় সমুদ্রসীমার মাত্র দেড় কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি দেশটি (ভারত)।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস জরিপের কাজে ওই চীনা জাহাজটি ঘুরতে যতটুকু জায়গা প্রয়োজন, ভারতের কাছে বাংলাদেশ কেবল সেটুকু ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল। এজন্য পেট্রোবাংলা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ওই সময় চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু ভারত তাদের সমুদ্রসীমায় চীনা জরিপ জাহাজ প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এক্সন মবিলের এই তৎপরতা শেখ হাসিনার বিদায়ের পরেও ছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন আবারও এক্সন মবিলকে তেল গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়ার বিষয়ে পেট্রোবাংলাকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু পেট্রোবাংলার তরফ থেকে ওই সময় সরকারকে জানানো হয়, তেল গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান করতে হয়। দরপত্র ছাড়া এভাবে ব্লক ইজারা দেওয়া আইনসঙ্গত হবে না।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তারা যখন দেখতে পেলেন কোনোভাবে আইনের মধ্যে থেকে এক্সন মবিলকে গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়া সম্ভব না, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের করা বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধান বাতিল করার জন্য আফসোস করেছিলেন। কারণ এই আইনটি থাকলে দরপত্র ছাড়াই চুক্তি করা সম্ভব হতো।
এক্সন মবিলের সেই তৎপরতা এখনো রয়েছে বলে জানা গেছে। অতি সম্প্রতি তারা পেট্রোবাংলায় এসে বৈঠক করেছে। ঠিক আগের মতোই দরপত্রের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট ১৫টি ব্লক ইজারা চেয়েছে। তারা পেট্রোবাংলায় একটি প্রেজেন্টেশনও দিয়েছে। ফলে এই তৎপরতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এখন কীভাবে সাড়া দেয় সেটি দেখার বিষয়।
বাংলাদেশে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোট ৬ বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালের পর ১৯৯৭, ২০০৮, ২০১২, ২০১৬ এবং ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে কোনো দরপত্রে ব্যাপকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং কোরিয়ান কোম্পানি সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান কাজ মাঝপথে ফেলে রেখে চলে গেছে। ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি বিদেশ এবং অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড বঙ্গোপসাগরে কাজ করছে। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্য ভারতীয় কোম্পানির মতো এই কাজটিও চলছে ঢিমেতালে। এর বাইরে যুক্তরাষ্টের কোম্পানি কনোকো ফিলিপস এবং কোরিয়ান কোম্পানি পোসকো দাইয়ু কাজের মাঝপথে ব্লক ফেলে চলে গেছে।
সবশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দরপত্র বাতিল না করে সময় বাড়িয়ে বিদেশি কোম্পানিকে বিনিয়োগে আহ্বান জানায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি আর দরপত্র জমা দেয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশে কোনো বড় বিনিয়োগ আসার পরিবেশ না থাকায় এমনটি হয়েছে বলে জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এমনকি এক্সন মবিল, যারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য অতীতে আগ্রহ দেখিয়েছিল, তারাও ২০২৪-এর দরপত্রে কোনো সাড়া দেয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী যেসব কোম্পানি রয়েছে এর মধ্যে এশিয়ার চারটি কোম্পানি বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে। এই কোম্পানিগুলো হলো চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল করপোরেশন (সিএনওওসি), সৌদি আরবের সৌদি অ্যারামকো, মালয়েশিয়ান কোম্পানি পেট্রোনাস, ভারতের কোম্পানি ওএনজিসি বিদেশ। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, নরওয়ে এবং ব্রাজিলের কয়েকটি বড় কোম্পানি রয়েছে।
Manual2 Ad Code
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশে চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ কঠিন হবে। একই সঙ্গে রাশিয়ান কোম্পানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্টের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিডিং রাউন্ডে রাশিয়া আসতে পারবে কি না সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে আমাদের যৌথ উদ্যোগে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। এখন চীন এবং মালয়েশিয়াও সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভালো করছে। বাংলাদেশ যদি সরকারি পর্যায়ে কোনো কোম্পানির সঙ্গে যৌথ মূলধনি কোম্পানি করে তাহলে এই কাজ করা কঠিন হবে না। এতে বাংলাদেশকে যারা ভূ-রাজনীতির এই চক্করে ফেলেছে তাদেরও কিছু বলার থাকবে না। তবে এজন্য বাংলাদেশকে বিনিয়োগ করতে হবে এবং ঝুঁকি নিতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষায় এমনটি করাই যেতে পারে।
জানতে চাইলে বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোর্তজা আহমেদ ফারুক চিশতী বলেন, পিএসসিকে সফল করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যেকোনো উপায়ে খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে পিএসসি সফল করতে হবে। তিনি ১৯৯৩ সালের পিএসসির উদাহরণ টেনে বলেন, তখন যোগ্য কোম্পানিকে ডেকে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু কেউ এই বিষয়ে অভিযোগ তুলতে পারেনি। এবারও এমনটি করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মোর্তজা বলেন, রাশিয়ান কোম্পানি রূপপুরে কাজ করতে গিয়েই অনেক বিপাকে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশে তারা পুনরায় কাজ করতে আসবে এমনটি এখনই চিন্তা করা কঠিন। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে তাতে চীনা কোম্পানির বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মালয়েশিয়ান কোম্পানি পেট্রোনাস বাংলাদেশে কাজ করার আগ্রহ দেখালেও সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, আমি বিষয়গুলো কম বুঝি। তবে আমি মনে করি, আমাদের অন্তত এইটুকু স্বাধীনতা থাকা উচিত যাতে আমরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।