দীর্ঘ ৫ বছর ধরে সিঙ্গাপুর আছেন সাখাওয়াত হোসেন। তার বাবা-মা থাকেন গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। প্রতি মাসেই তিনি দেশে পাঠাচ্ছেন অর্থ। কিন্তু সাখাওয়াত ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন সিঙ্গাপুরে থাকা আরেক বাংলাদেশির মাধ্যমে। এতে তিনি লাখে অতিরিক্ত পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি পান, যেটা ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে প্রায় অর্ধেকের বেশি। ফলে একদিকে সরকার রেমিট্যান্স হারাচ্ছে অন্যদিকে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। এতে সার্বিকভাবেই দেশের ক্ষতি হচ্ছে।
Manual6 Ad Code
সাখাওয়াতের মতোই হাজার হাজার প্রবাসী হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন দেশে। পাশাপাশি দেশ থেকেও অর্থ পাচার হচ্ছে। এ নিয়ে সম্প্রতি পুলিশের একটি ইউনিট গোপন প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরের চেয়ে মফস্বল এলাকায় দেদার হুন্ডি কারবার হচ্ছে। ওই তালিকায় ১ হাজার ২২৩ হুন্ডি কারবারির নাম আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায় যুক্ত।
দেশের অর্থনীতির ফুসফুস বলা হয় রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়কে। কিন্তু এ রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশই এখন ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে যাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির মাধ্যমে স্বজনদের কাছে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এমনকি প্রবাসীদের টার্গেট করে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী হুন্ডিচক্র। বর্তমানে দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে একাধিক চিহ্নিত হুন্ডি কারবারি পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে।
পুলিশের গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে হুন্ডিতে প্রতি ডলার বা অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে পাঁচ থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো বা কাগজপত্রের ঝামেলা ছাড়াই প্রবাসীদের কর্মস্থল বা বাসস্থান থেকে টাকা সংগ্রহ করেন হুন্ডি এজেন্টরা। আর বাংলাদেশে প্রবাসীর পরিবারের কাছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে টাকা।
Manual2 Ad Code
হুন্ডির ইতিহাস : মধ্যযুগে ভারতে সম্পদ লেনদেনের জন্য প্রথম এ পদ্ধতির সূচনা হয়। উপমহাদেশে হুন্ডির উদ্ভব মুঘল আমলে। রাজধানী দিল্লি থেকে প্রদেশগুলোর দূরত্ব ছিল অনেক বেশি। তাছাড়া পথঘাটও ছিল অনেক দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল। প্রদেশগুলো থেকে আদায়কৃত রাজস্ব দিল্লিতে প্রেরণের জন্য স্থানীয় মহাজনদের সাহায্য নিতেন বিভিন্ন প্রদেশের মুঘল প্রশাসকরা। স্থানীয় মহাজনদের ভারতজুড়ে নিজস্ব নেটওয়ার্ক ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে অর্থ বিনিময় করতেন এক ধরনের দলিলের মাধ্যমে, যাকে তুলনা করা যায় আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে। এ দলিলকেই বলা হতো হুন্ডি।
দেশ-বিদেশে ১২২৩ কারবারি : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যনুযায়ী, দেশ-বিদেশে সক্রিয় এমন এক হাজার ২২৩ জন শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের হুন্ডি কারবারির একটি চক্র রয়েছে। তারা মূলত তিনটি স্তরে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারীরা দুবাই, কুয়ালালামপুর, রিয়াদ, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে বসে পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করাই তাদের কাজ। আরেকটি গ্রুপ দেশীয় এজেন্ট ও অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে চিহ্নিত। তারা বিদেশি মুদ্রা জমা হওয়ার পর বাংলাদেশে সমপরিমাণ টাকার সঙ্গে বাড়তি কমিশনসহ প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় এদের নেটওয়ার্ক সবচেয়ে শক্তিশালী। তাছাড়া ডিজিটাল হুন্ডি বা ‘এমএফএস’ চক্রও তৎপর আছে। তারা নগদ টাকার চেয়ে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্টগুলোও মাঝেমধ্যে ব্যবহার করছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, হুন্ডির চেয়ে বর্তমানে ‘ডিজিটাল হুন্ডি’ আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। চক্রগুলো বিদেশে বসেই অ্যাপসের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা তাদের এজেন্টদের নির্দেশ দেয়। আর দেশে প্রবাসীর স্বজনের মোবাইলে মুহূর্তেই চলে যাচ্ছে টাকা। এটি দেশীয় লেনদেন মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এর বিপরীতে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে না। বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশেই থেকে যাচ্ছে এবং তা দিয়ে চোরাচালান, অর্থ পাচার বা অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আসায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশেও পাচার হচ্ছে টাকা : কুরিয়ার ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের একাংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারে জড়িত থাকার বিষয়টি পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করছে। তারা দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর, চেকপোস্ট ও সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করছে। এমনকি বাংলাদেশে অবস্থানকারী চোরাকারবারিরা হুন্ডি কারবারিদের টাকা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট কোড বা চিরকুট সংগ্রহ করে। চিরকুট যখন বিদেশে অবস্থানকারী সংশ্লিষ্ট হুন্ডি এজেন্টের কাছে পৌঁছায়, তারা তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে সমমূল্যের অর্থ পরিশোধ করে। দ্রুত ও গোপন নিশ্চয়তার কারণে চোরাকারবারিদের কাছে হুন্ডি পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
Manual1 Ad Code
হুন্ডিচক্রের প্রবাসে অবস্থানকারীরা বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রা ও তার স্বজনদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হিসাব নম্বর সংগ্রহ করে। পরে অ্যাপের মাধ্যমে চক্রের বাংলাদেশে অবস্থানকারীদের কাছে সে নম্বর পাঠানো হয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টদের মাধ্যমে দেশে প্রবাসীদের স্বজনদের হিসাবে টাকা পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশ থেকে যে টাকা স্বজনদের কাছে পাঠানো হচ্ছে, সে টাকা চক্রের কাছে দেন অবৈধ টাকার মালিকরা বা হুন্ডির নেপথ্যের সুবিধাবাধী ব্যক্তি।
কড়াকড়িতেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না : হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচারের ঘটনা যেন থামছেই না। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো ব্যাপক নজরদারি, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও সতর্কতার মাধ্যমে কড়াকড়ি আরোপ করেও হুন্ডিবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে । দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাচার ব্যক্তিপর্যায়ে থাকলেও কয়েক বছর ধরে এ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোনো কোনো মামলায় অপরাধের প্রমাণাদিসহ আদালতে চার্জশিট দেওয়ার পরও তাদের রোখা যাচ্ছে না।
বৈধ চ্যানেলে দিতে হয় না আয়কর : বাংলাদেশিরা বিদেশ থেকে মূলত দুটি উপায়ে বাংলাদেশে টাকা পাঠান। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে হুন্ডি। অন্যটি হচ্ছে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যম। প্রথমটি বাংলাদেশের আইনে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হুন্ডির টাকা দেশে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তা কালো টাকায় পরিণত হয়। অথচ বৈধ চ্যানেলে টাকা আনলে সে টাকায় কোনো আয়কর দিতে হয় না। উপরন্তু ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে সরকার আড়াই শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা দেয়।
১৫টি দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ : পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, নাানা কৌশলে ১৫টি দেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হয়। আর এর সঙ্গে জড়িতরা নিরাপদেই রয়েছে। বিভিন্ন দেশ বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় পাচারকারীরা টাকা পাচারে ওইসব দেশকে বেছে নিচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন সংস্থাসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ রয়েছেন পাচারকারীর তালিকায়।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, হুন্ডির মাধ্যমে ক্যাসিনো ব্যবসার হোতাদের বিদেশে অর্থ পাচারসহ দেশের হুন্ডি ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের খোঁজে গোয়েন্দারা কাজ করছেন। তারপরও তারা প্রকাশ্যেই হুন্ডি ব্যবসা চালিয়ে আসছে। এক অদৃশ্য শক্তির জোরে এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে। কানাডা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাই চলে যাচ্ছে টাকা। বিভিন্ন দেশ বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় পাচারকারীরা ওইসব দেশকে বেছে নিচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন খাতে এসব টাকা বিনিয়োগ করছে।
ইয়াবা কারবারিরাও ব্যবহার করে হুন্ডি : আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিসংখ্যানে ভারত ও মিয়ানমারে পাচার হওয়া অর্থ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এতে দেখা গেছে, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব ও কোস্ট গার্ডের অভিযানে প্রায়ই ইয়াবা উদ্ধার হয়। উদ্ধার এসব ইয়াবার লেনদেন হুন্ডির মাধ্যমেই হয়। প্রতিটি ইয়াবার দাম ৬০ টাকা করে ধরলে মাসে ১৫ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।