দেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। তুচ্ছ কারণে একজন আরেকজনের প্রাণ নিয়ে নিচ্ছে। এক ঘটনার নৃশংসতা ছাপিয়ে যাচ্ছে অপর ঘটনাকে। রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংঘাত-সংঘর্ষ ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনাতেও প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।
অজ্ঞাত হিসেবে প্রতি দিন দাফন করা হচ্ছে ২টি মরদেহ। নদীতেও বাড়ছে লাশের সারি। কিন্তু এত ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও নেই সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার। দেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটছে পারিবারিক কলহের কারনে।
গত কয়েক মাসে মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কমলেও বেড়েছে পারিবারিক সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় মৃত্যুরও সংখ্যা। যার আধিকাংশেরই বলি হচ্ছে নারী ও শিশুরা। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাতেও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বেড়েছে মব সন্ত্রাসে মৃত্যুর সংখ্যাও।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের ৪০ শতাংশ হয় পারিবারিক কলহের কারণে। নিরপরাধ শিশুরাও স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের কারণে হত্যার শিকার হয়।
Manual6 Ad Code
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১০ থেকে ১২ জন। এর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক কারণে। আর এর প্রধান শিকার নারী ও শিশু।
পুলিশের তথ্য :
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট মামলার সংখ্যা ছিল ২৮৮টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৪টি মামলা হয় ঢাকা রেঞ্জে। আর মার্চ মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডজনিত মামলা হয় ৩১৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলা হয় পুলিশের ঢাকা রেঞ্জে-৭১টি। এরপর চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৬১টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে খুনের মামলা হয় ৪১টি।
সড়ক দুর্ঘটনা :
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গেল এপ্রিল মাসে সারা দেশে ৫২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১০ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে নিহতের সংখ্যা ১৭ জন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত মার্চ মাসে দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ২২১ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৬ জন নারী ও ৯৮ শিশু রয়েছে।
Manual2 Ad Code
দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিলেন ১৫ দশমিক ৪২ জন। আর মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ১৭ দশমিক ১৬ জন।
মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য :
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মার্চ মাসে আততায়ী বা দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন ৩ জন এবং এপ্রিলে ৫ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে মৃত্যুর ঘটনা ছিল যথাক্রমে ২ ও ১ একজন।
তবে এই দুই মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। মার্চ মাসে সীমান্তে কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা না ঘটলেও এপ্রিল মাসে ৩টি খুনের ঘটনা ঘটে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে। মার্চে ৭৩ জন নারী ও শিশু খুনের ঘটনা ঘটে।
Manual1 Ad Code
এপ্রিল মাসে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৮৯ জন। একইভাবে মার্চের তুলনায় এপ্রিলে বাড়ে মবে মৃত্যুর ঘটনা। মার্চে মব সন্ত্রাসে মৃত্যু হয় ১৯ জনের, এপ্রিলে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২১ জন।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনেকাংশেই কমেছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন যথাক্রমে ১৪ ও ৩ জন।
Manual1 Ad Code
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এই ৪ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৫০টি। এর মধ্যে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন ২৩ জন, বিএনপির নিজেদের মধ্যে অন্তঃদলীয় কোন্দলে নিহত হন ১৪ জনবিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ছিল ৮ জন। আর বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষেও ঘটনায় নিহত হন একজন।
আসকের তথ্যে দেখা যায়, বছরের প্রথম চার মাসে ১১৫ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে নিখোঁজের পর ২০টি শিশুকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু হয় ৩৪টি শিশুর। আর গৃহে নির্যাতনের পর মারা যায় ২০টি শিশু।
আসক এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন (জানুয়ারি-মার্চ) মাসে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সে মারা যায় ৬০ জন নারী। এর মধ্যে শুধু স্বামীর হাতেই খুন হন ৪১ জন নারী। এ ছাড়া স্বামীর ও নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারাও নারীদের খুনের ঘটনা আছে। শ্বশুরবাড়ি ও নিজ পরিবারের এবং সমাজের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েও প্রতি বছর নারীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আত্মহত্যা করছে।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, অনৈতিক সম্পর্ক, সহনশীলতার অভাব, দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, আত্মকেন্দ্রিকতা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব, অসচ্ছলতা ইত্যাদি কারণে ঘটছে এসব ঘটনা।
অপরাধ বিশ্লেষক মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, শুধু আইন প্রয়োগই নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। লিঙ্গ সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটাকেও ঠিক করতে হবে। সমাজে যে অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে তাও মেরামত করতে হবে। সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ সেই সঙ্গে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করত। তা হলেও অনেকাংশে নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
বেওয়ারিশ মরদেহ :
বেওয়ারিশ হিসেবেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা ৬৪৩টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে দাফন ও সৎকার করা হয়েছে।
সেই হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় ৫৪ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়। বেওয়ারিশ হিসেবে গড়ে প্রতিদিন দাফন ও সৎকার করা হচ্ছে প্রায় দুজনের লাশ। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬৪১টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হয়।
সারা দেশে নদী এলাকা থেকেও মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়ছে। হত্যার পর প্রমাণ লোপাট ও আইনের চোখ ফাঁকি দিতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার জন্য অপরাধীরা নদী বেছে নিচ্ছে। ২০২৪ সালে যেখানে নৌ পুলিশ গড়ে প্রতি মাসে ৩৬টি মরদেহ উদ্ধার করেছিল সেখানে ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৪৩টি মরদেহ উদ্ধার করে।
নাম প্রকাশ না করে শীর্ষ একজন রাজনৈতিক নেতা বলেন, এসবের প্রধান কারণ সমাজে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার দিনকে দিন বাড়ছে। আর বিশেষ করে সমাজে ও রাষ্ট্রে সুশাসনের অভাব রয়েছে।
সরকার ও দেশের বিচারালয় এবং সরকার প্রধানের উচিত স্ব-উদ্যোগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।