জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ওপর সেই পুলিশই এখন নিয়মিত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত অনেকেই অবলীলায় পুলিশের গায়ে হাত তুলছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থানার ভেতরেও হামলার ঘটনা ঘটছে। আবার চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের ধরতে গেলে মব সৃষ্টি করে পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এসব হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ বলছে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আস্থার সংকট কাটাতে পুলিশ ধৈর্য ধারণের কৌশল অবলম্বন করছে। জনমনে পুলিশের প্রতি বিরূপ মনোভাব কাটাতে এক ধরনের ‘ধীরে চল’ নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে নৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। ৫ আগস্টের পর এই অবস্থান আরও নাজুক হয়েছে।
এ ছাড়া জনসংখ্যা অনুপাতে পুুলিশের ভারসাম্য সেই সঙ্গে অতীতে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারার কারণেও ঘটছে এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলিতে অবৈধ অটোরিকশা জব্দ করে নিয়ম অনুযায়ী চালকসহ অটোরিকশাটি ডাম্পিংয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন কনস্টেবল মো. আব্দুল কুদ্দুস (৫৫)। পথে রিকশাচালক চলন্ত রিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন আব্দুল কুদ্দুসকে। গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে একটি হাসপাতালে চিকিসাধীন তিনি। এটি গত শনিবারে ঘটনা।
গত ১১ মে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছিনতাই মামলার শীর্ষ আসামিদের গ্রেফতার করতে যায় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। সেখানে মব সৃষ্টি করে ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করে ছিনতাইকারীরা।
গত পহেলা মে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ছিনতাইয়ের ঘটনার তদন্তে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে একটি শটগান ছিনিয়ে নেয় দুষ্কৃতকারীরা।
গত ২৫ মার্চ রাতে পলাশবাড়ী থানায় ঢুকে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেন পলাশবাড়ী উপজেলা জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এতে ওসিসহ ৮ পুলিশ সদস্য আহত হন।
গত ২৩ মার্চ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে মোটরসাইকেল তল্লাশির সময় এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে লিয়ন (২৮) নামে এক যুবক।
গত ১৫ মাচ রাজধানীর উত্তরায় এক রিকশাচালককে পেটানোর অভিযোগে শপিং কমপ্লেক্স ঘেরাও করে তাণ্ডব চালান রিকশা ও অটোরিকশা চালকরা। এ সময় পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে তারা।
গত ২ জানুয়ারি ভৈরব পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ আলী সোহাগকে আটক করে থানায় নেওয়ার পথে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে সোহাগকে ছিনিয়ে নেয় তার লোকজন।
চলতি বছরের ৭ এপ্রিল সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে অভিযান পরিচালনাকালে চালকরা হাইওয়ে থানার সামনে বিক্ষোভের সময় পুলিশের ওপর হামলা করে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত এপ্রিল মাসে পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৬টি, এর আগের মাসে (মার্চ) মামলা হয় ৬৩টি, ফেব্রুয়ারিতে হয় ৪২টি এবং জানুয়ারি মাসেও ৪২টি মামলা হয়।
২০২৫ সালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলার সংখ্যা ছিল ৫৯১টি। ২০২৪ সালে মামলা হয় ৬৪৩টি।
Manual6 Ad Code
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ২০২৪ সালে প্রতি মাসে গড়ে মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪টি। ২০২৫ সালে মাসে গড়ে মামলা হয় ৪৯টি আর চলতি বছর প্রতি মাসে মামলা হচ্ছে গড়ে ৫৩টি।
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৮ মাসে সর্বাধিক ১৭০টি মামলা হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার বেশ কিছু সংঘর্ষ ঘটে।
Manual7 Ad Code
ফলে ওই মাসে সর্বাধিক সংখ্যক পুলিশ অ্যাসল্টের মামলা রুজু হয়। ওই এক মাসে মামলার সংখ্যা বাদ রেখে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা হিসাব করলে ২০২৪ সালে গড় মামলা ৪৩টি।
সেই হিসাবে গত তিনটি সরকারের ২৮ মাসে পুলিশ অ্যাসল্টের ঘটনায় গড়ে সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির মিরপুর বিভাগের একটি থানার ওসি বলেন, মানুষের ভেতর ভীতি কমে গেছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে পুলিশও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ধৈর্য ও সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, পুলিশের অতীত কর্মকাণ্ড, নৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থান এবং দেশের জনসংখ্যা-পুুলিশের অনুপাতে ভারসাম্যহীনতার কারণে অনাকাক্সিক্ষত এসব ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, অতীত পুলিশের অনেক সদস্য স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় পক্ষপাতমূলক অনেক আচরণ করেছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ মনোভাব জন্মেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ তার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশকে নানা চাপের মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ এসব বোঝে না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেও ঊর্ধ্বতনদের অন্যায়কে মাথা পেতে নিতে হয়।
এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে-‘পুলিশ মারলে কিছু হয় না’। রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে এ ধরনের অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়। এসব কিছু মিলেই এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো ঘটছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
Manual1 Ad Code
পুলিশ আক্রান্তের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদারের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪ পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা বহু ত্যাগ, ধৈর্য ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
Manual2 Ad Code
গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও অস্ত্র ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র ও দেশদ্রোহিতার শামিল।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।