দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ‘মব’ নামে ভয়ানক আতঙ্ক। ‘মব ভায়োলেন্স’ কিংবা ‘গণপিটুনির’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, হামলা-জখমের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ছিনতাইকারী, চোর কিংবা ইভটিজার কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগে কথিত গণপিটুনি দিয়ে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন এক শ্রেণির মানুষ। এতে অনেক নিরীহ মানুষও হামলার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে। তা ছাড়া চিহ্নিত অপরাধী হলেও এভাবে মব তৈরি করে হত্যা-জখম করাও আইনবহির্ভূত এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে এমন এক ঘটনার শিকার হয়েছিলেন নিরীহ এক ব্যক্তি। নেশাগ্রস্ত ও ছিনতাইকারী জুয়েল রানা লোক জড়ো করে গাড়ি থামিয়ে ওই ব্যক্তিকে রক্তাক্ত করেছে এবং গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এমন হামলা বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরেও এ ধরনের হামলা বা গণপিটুনি ঘটাচ্ছে। এতে জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত রবিবার একদিনে শুধু রাজধানীতেই গণপিটুনির শিকার হয়েছেন আটজন। তাদের সবাইকে চুরি ও ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনি দিয়েছে জনতা। আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছুদিন ধরে মব হামলা চলেছে। ফলে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার কথা বলা হলেও থামছে না মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা। এ ছাড়া গত সাত মাসে যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনির ঘটনায় জড়িত কিংবা তৈরির পেছনে রয়েছেন তাদের নজরদারির মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সরকার।
Manual3 Ad Code
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে জনমানুষকে বিরত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী- এ বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশের ১৬ জন মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ৭, খুলনায় ১, রাজশাহীতে ২, রংপুরে ২, সিলেটে ২, চট্টগ্রামে ১, বরিশালে ১ জন। ফেব্রুয়ারিতে গণপিটুনির শিকার ১১ জনের মধ্যে ঢাকায় ৩, চট্টগ্রামে ৩, বরিশালে ৩ এবং ময়মনসিংহে ২ জন। তবে ৯ মার্চ একদিনেই শুধু ঢাকাতেই ৮ জন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। অপরদিকে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর-২০২৪ পর্যন্ত সারা দেশের ১২৮ জন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। আসকের পরিসংখ্যানে বলা হয়, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৫৭ জন, রাজশহীতে ১৯, চট্টগ্রামে ১৭, খুলনায় ১৪, বরিশালে ৭, রংপুরে ৫, ময়মনসিংহে ৫ এবং সিলেটে ৪ জন।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত সাত মাসে সারা দেশে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনায় ১১৯ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন।
Manual3 Ad Code
এদিকে গত রবিবার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে এক যৌথ ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম বলেছেন, “আমরা এখন থেকে নৈরাজ্যের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছি। জনগণকে জানাতে চাই, যেখানেই মব জাস্টিস বা মব ভায়োলেন্স হবে সেখানে যেই হোক না কেন, আমরা এখন থেকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হব।”
Manual4 Ad Code
তিনি বলেন, ‘তাদের (মব সৃষ্টিকারী) চিহ্নিত করা হচ্ছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি পাই বা যদি মামলা হয়, আমরা ব্যবস্থা নেব। তারা নজরদারিতে আছে। গত ৭-৮ মাসে যে যেখানে ঝামেলা করেছে, যে যেখানে মব করেছে, সবাইকে নজরদারিতে আনার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে বলা হয়েছে।’
মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, এখানে কোনো শৈথিল্যের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ১৬তম সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিটি জায়গায় এসব ঘটনা ঘটছে, এ জন্য মানুষ মনে করছে যে অথরিটি বোধহয় অ্যাকশন নিতে পারে না বা নেবে না। পুলিশের মনোবল কমে গেছে। এর সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা। আরও একটা কারণ হতে পারে, যারা অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা মব ভায়োলেন্স করছে। তারা অপরাধীদের নিয়ে কিংবা নিজেরা এটি করতে পারে। তবে এগুলো কঠিনভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’
তিনি বলেন, মব ভায়োলেন্সের ঘটনা কঠোরভাবে দমন করতে হবে, এখানে শৈথিল্যের কোনো জায়গা নেই। শৈথিল্যের সুযোগ হলে তা বাড়তেই থাকবে। যেগুলো হচ্ছে সেগুলো প্রতিরোধ করা মুশকিল। কারণ কখন কোথায় মব হবে তা জানা যায় না। তবে ঘটে যাওয়ার পর এসব লোকের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই ভয়টা হবে। আর প্রিভেন্টিভ পুলিশের প্যাট্রোলিংটা খুব জোরেশোরে হতে হবে। যাতে কোথাও ঘটনা ঘটে গেলে তাড়াতাড়ি কাভার করা যায়। গুলশানে যে মবের ঘটনা ঘটে গেল, সেখানে শুধু তিনজনকে নয়, ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করতে হবে। ওই কেসে দ্রুত চার্জশিট দিতে হবে। তাহলেই থামবে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্ত থাকতে হবে, দয়া-দাক্ষিণ্য দেখানোর কিছু নেই।’
বিশেষজ্ঞ মতামত
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের চারপাশে নানা ধরনের অপরাধ ঘটছে। এর প্রেক্ষাপটে কখনো জনতা বা ভুক্তভোগী নিজেরাই অপরাধের বিচার করছেন বা গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলছেন। এ ধরনের অবস্থা বা সমাজে যখন অপরাধ বেড়ে যায় তখন বুঝতে হবে যে সেখানে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে শতভাগ নেই। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের একটি অংশ ভয় পায় না এবং অপরাধ ও অপরাধীর বিচার হবে এই আস্থাও তারা রাখতে পারছে না। তখন মানুষ নিজেরাই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং গণপিটুনি দিয়ে বিচার করতে চায়। এই দুটো পরিস্থিতির দুটোই বর্তমানে বাংলাদেশের পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার কিছু কিছু ঘটনা আছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু লোক একত্রিত হয়ে কাউকে হেয় করা, গণপিটুনি দেওয়া অথবা কর্মস্থল-আবাস্থল ভাঙচুর করা- এই বাস্তবতাও আছে।’
তিনি বলেন, ‘তবে গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স একটি ছোঁয়াচে রোগের মতো। এক জায়গায় ঘটনা ঘটলে সেটি প্রকাশ বা প্রচার পেলে অন্য জায়গাতে তা ছড়িয়ে পড়ে।’
‘সরকারের পক্ষ থেকে যে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হচ্ছে সেটিও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কারণ কোথাও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে না। একই ব্যক্তি ক্রমান্বয়ে অপরাধ করে যাচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে মানুষকে বিরত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। এটা অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন তবুও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে।’
Manual7 Ad Code
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) ইনামুল হক সাগর বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। কেউ যদি নিজের হাতে আইন তুলে নেয় তবে সেটাও একটি অপরাধ। কোথাও কেউ যদি মব ভায়োলেন্স ঘটায় তবে সে যেই হোক এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা আইন অনুযায়ী এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’