মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে শুরুতেই বিব্রত সরকার
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে শুরুতেই বিব্রত সরকার
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Manual8 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় মাস পার হয়েছে। এরই মধ্যে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। মাঠ প্রশাসনের জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার-ভূমি (এসিল্যান্ড) বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সমালোচনার জন্ম দিচ্ছেন। তাদের নৈতিক স্খলন ও দুর্নীতির বিষয়টিও সামনে আসছে। কোনো কোনো কর্মকর্তার আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সরকারের এখনই এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তদন্ত করে দায়ী কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে সবার কাছে একটা বার্তা যায় যে এসব করে অন্তত এ সরকারের আমলে পার পাওয়া যাবে না।
Manual2 Ad Code
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তারা তা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। গুরুতর ক্ষেত্রে কারো কারো বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনিয়ম করলে কারো বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে তারা কার্পণ্য করবেন না।
Manual6 Ad Code
সম্প্রতি ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদের বিরুদ্ধে একজন নারী ইউএনওর অডিও ভাইরাল হয়। একাধিক নারীর সঙ্গে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিনের আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একজন সাংবাদিক ‘স্যার’ না বলায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম ওই সাংবাদিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। ‘প্রেস ক্লাবের সদস্য না হলে কেউ সাংবাদিক হতে পারে না’—এমন অদ্ভুত দাবিসহ গাইবান্ধা সদরের এসিল্যান্ড জাহাঙ্গীর আলম বাবুর তোপের মুখে পড়েন আরেক সাংবাদিক।
দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠান কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার এসিল্যান্ড ফয়সাল আল নূর। একজন সাংবাদিককে আটক করে বিতর্কের জন্ম দেন কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার এসিল্যান্ড প্রতীক দত্ত।
যদিও এরই মধ্যে ডিসি আব্দুল্লাহ আল মাসউদ, ইউএনও মো. আলাউদ্দিন ও এসিল্যান্ড ফয়সাল আল নূরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠ প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তা বেপরোয়া আচরণ করছেন, যা সরকারকে বিব্রত করছে। সরকারও বিষয়গুলো খুব শক্তভাবে দেখছে। দোষী কাউকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এ সরকারের নেই। সেই বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনে যা ঘটছে এতে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। আমরা যখন সহকারী কমিশনার ছিলাম, ডিসির একেবারে নখদর্পণে ছিলাম। আমরা কোথায় যাচ্ছি, কার সঙ্গে মিশছি, আমাদের আচার-আচরণ কী রকম- এগুলো ডিসিরা মনিটর করেছেন। তারা আমাদের গাইড করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, ধমক দিয়েছেন। একটি পরিবারের মতো। আমার ধারণা এখন ওইরকম একটা নিবিড় সম্পর্ক নেই। কোথাও ঘাটতি আছে। আন্তরিকতাটা এখন আরও নেই।’
তিনি বলেন, ‘ডিসি তো তার সহকারী কমিশনার, এসিল্যান্ড, ইউএনও- কার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবে, সেই বিষয়ে গাইড করবেন। কারো সঙ্গে যদি এসিল্যান্ড-ইউএনওর ভুল বোঝাবুঝি হয়, তিনি সেটা তাৎক্ষণিকভাবে ডিসিকে জানাবেন।’
‘কেউ স্যার না ডাকলে, বা বিরুদ্ধে নিউজ হলে- ক্ষুব্ধ হওয়া, আটক করা এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়। হাতিয়ায় যে ঘটনা ঘটেছে- এগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তদন্ত করে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে এটা দেখে অন্য কারো এ ধরনের কাজ করার মানসিকতা না থাকে। অন্যরা সতর্ক হবেন,’ বলেন সাবেক আমলা আবদুল আউয়াল মজুমদার।
Manual2 Ad Code
মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, ‘প্রশাসনের যে জায়গায় আমরা কোনো অনিয়মের খবর পাচ্ছি, পত্রিকায় কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের যে খবরগুলো আসছে- আমরা তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইন ও বিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেই আইন ও বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে কিছু করে এ দায় তাকে নিতে হবে। সরকার আইন অনুযায়ী যা যা করার করবে। কারণ রাষ্ট্র জনগণের।’
গত ৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদের বিরুদ্ধে সদর উপজেলার সদ্য বিদায়ী ইউএনও হোসনে আরার অডিও ভাইরাল হয়। ওই অডিওতে তিনি ডিসির বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ছড়িয়ে পড়া অডিওতে সদর উপজেলার সদ্য বিদায়ী ইউএনও হোসনে আরাকে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে শোনা গেছে।
সেখানে তিনি ওই সাংবাদিককে বলেন, জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ তাকে (ইউএনও) টাকাসহ বিভিন্ন অনৈতিক প্রস্তাব দেন। তাতে রাজি না হওয়ায় বিধিবহির্ভূতভাবে বদলি করিয়েছেন।
ইউএনও বলেন, একটা মানুষের যত খারাপ দোষ থাকে সবকিছুই ওনার আছে। মন্ত্রীর পা ছুঁয়ে এসে জামায়াতের গলা ধরেন। ওনার কোনো চরিত্র নেই।
Manual1 Ad Code
ওই অডিও ভাইরাল হওয়ার পর মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) আব্দুল্লাহ আল মাসউদকে ঝিনাইদহ থেকে সরিয়ে দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাকে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসনে ন্যস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ইউএনওর আপত্তিকর ভিডিও
গত ১৬ মার্চ একাধিক নারীর সঙ্গে নোয়াখালীর হাতিয়ার ইউএনও মো. আলাউদ্দিনের আপত্তিকর ভিডিও বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়। তবে ইউএনওর দাবি, ভিডিওটি তার সম্মানহানির উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে ভিডিওর বিষয়ে সত্যতা পাওয়ায় পরের দিন ১৭ মার্চ আলাউদ্দিনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এসিল্যান্ডদের যত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
গত ৫ এপ্রিল সাংবাদিক পরিচয়ে ‘ভাই’ সম্বোধন করায় ক্ষুব্ধ হন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। জনসাধারণের সামনে তাকে ‘স্যার’ না বলে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করায় তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন বলে দাবি করেন। বলেন, ভাই কেন বললেন, সাধারণ মানুষ ভাববে আপনার সাথে আমার স্বজনপ্রীতি রয়েছে। সবাই আমাকেও সাধারণ মানুষ ভাববে।
ওইদিন কুড়িগ্রাম পৌর শহরের সাহা ফিলিং স্টেশনে দেশ টিভির কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জুয়েল রানার সঙ্গে তিনি এ আচরণ করেন।
এ ঘটনার একদিন আগে (৪ এপ্রিল) আরেক এসিল্যান্ড বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেন। গাইবান্ধা সদরে সরকারি বিধি ভেঙে তেলের পাম্পে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এসিল্যান্ড জাহাঙ্গীর আলম বাবুর তোপের মুখে পড়েন এক সাংবাদিক। ‘প্রেস ক্লাবের সদস্য না হলে কেউ সাংবাদিক হতে পারে না’—এমন অদ্ভুত দাবি তুলে তিনি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করেন বলেও অভিযোগ করেছেন ওই সাংবাদিক।
ওইদিন দুপুরে শহরের পুলিশ লাইন সংলগ্ন হাসনা অ্যান্ড হেনা ফিলিং স্টেশনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে জাগো নিউজের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি আনোয়ার আল শামীমের সঙ্গে তিনি এ আচরণ করেন।
গত ১ এপ্রিল অফিসে ভিডিও করায় মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠান কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূর। ভুক্তভোগী দুই সাংবাদিক হলেন দৈনিক মানবজমিনের দেবিদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি রাসেল সরকার এবং ফেস দ্য পিপল ও কুমিল্লার স্থানীয় পত্রিকা আমার শহরের দেবিদ্বার প্রতিনিধি আব্দুল আলিম।
সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া পরা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কুমিল্লার কর্মরত সাংবাদিকরাও। পরের দিন (২ এপ্রিল) ফয়সালকে সরিয়ে দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এর আগে গত ১২ মার্চ একজন সাংবাদিককে আটক করে বিতর্কের জন্ম দেন কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার এসিল্যান্ড প্রতীক দত্ত। নিকলীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে বাধা ও ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে দৈনিক নয়া দিগন্ত’র বাজিতপুর উপজেলা প্রতিনিধি আলী জামসেদকে আটক করা হয়েছিল।
আগে এসিল্যান্ড প্রতীক দত্তের অনিয়ম নিয়ে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে তাকে আটক করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক। পরে আদালতে তোলা হলে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।