গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ইসলামি দলগুলো নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে এক হওয়ার চেষ্টা করছে। আলোচিত ছয়টি ইসলামি দল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিসহ পাঁচ দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করছে। একই সঙ্গে একক ভোটব্যাংক তৈরিতে দলগুলো আসন সমঝোতা নিয়েও বেশ তৎপর। নির্বাচনে তাদের মধ্যে কীভাবে আসন ভাগাভাগি হবে তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে চলছে নানান আলোচনা।
ইসলামি দলগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, আসন ভাগাভাগি হবে আলোচনার মাধ্যমে। সবার চাহিদা ও এলাকার অবস্থান অনুযায়ী সমঝোতা করে প্রার্থী দেওয়া হবে। সমঝোতা হলেও আসন ছাড় দেওয়া কিংবা ত্যাগ ব্যতীত কোনো দলের সঙ্গে ঐক্য হবে না।
আসন ছাড় দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ৩ অক্টোবর খুলনায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক অনুষ্ঠানে বলেন, সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা হলে জামায়াতে ইসলামী আগামী জাতীয় নির্বাচনে ১০০ আসন ছেড়ে দিতে পারে। যেসব আসনে জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ বা কখনো নির্বাচন করেনি, সেসব আসন ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। নির্বাচনের এমন কিছু আসন থাকবে, যেসব আসনে আমরা নির্বাচন করতে পারবো না। যদিও আমরা ৩০০ আসন চূড়ান্ত করেছি। কিন্তু আলটিমেট কথা—যাদের সঙ্গে সমঝোতা করবো, তাদের সঙ্গে একটা ঐক্য হয়ে যাবে।
‘এমনও হতে পারে, সমঝোতা করতে করতে শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রায় ১০০ আসনও ছেড়ে দিতে হতে পারে। কমপক্ষে ২০০ আসনে আমরা নির্বাচন করবো।’ যোগ করেন তিনি।
আসন নিয়ে যেভাবে সমঝোতা
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরীর একজন নেতা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘ইসলামি দলগুলো প্রথমবারের মতো এক বাক্সে ভোট আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেদিকে চিন্তা রেখেই নির্বাচনি সমঝোতা হবে। যেমন- বরিশালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অবস্থান ভালো, সেখানে হয়তো জামায়াত প্রার্থী দেবে না। আবার পিরোজপুর, পাবনা, কক্সবাজার, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতের অবস্থান ভালো, সেখানে অন্যান্য ইসলামী দল হয়তো তাদের প্রার্থী রাখবে না। আল্লামা মামুনুল হকের দল (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন- তাদেরও চাহিদা অনুযায়ী সমঝোতা হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার নির্বাচনি ঐক্য প্রক্রিয়াধীন। সবার অগ্রাধিকার সমঝোতা। এটা সব দলের চাহিদা, অবস্থান ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুস আহমাদ বলেন, ‘সমঝোতার ক্ষেত্রে আমরা দেখবো যে কোন আসনে কোন দলের সাংগঠনিক শক্তি মজবুত, জনশক্তি বেশি এবং প্রার্থীও সেই মানের; এভাবে এসব বিষয় বিবেচনা আনা হবে। অর্থাৎ প্রার্থীর মান নজরে রাখবো, সাংগঠনিক শক্তি কেমন তাও দেখবো। জনসমর্থন এবং সমাজে তার অবস্থান কেমন এটাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সব দলের মাঝ থেকে প্রার্থী দেওয়া হবে।’
Manual5 Ad Code
তিনি বলেন, ‘ইসলামি দল যারা আমরা একযোগে চলছি, সবার ক্ষেত্রে একই কথা। যে দলের যেখানে প্রার্থীর অবস্থান ভালো, আমরা সেখানে তাকে বেশি গুরুত্ব দেবো। প্রায় সব দলের ত্যাগের মানসিকতা থাকতে হবে।’
মাওলানা ইউনুস আহমাদ বলেন, ‘তফসিলের আগে সব কাজ শেষ করতে চাই আমরা। তফসিল ঘোষণা হলেই নির্বাচনি সমঝোতা হবে।’
মাওলানা মামুনুল হকের দল বিএনপির দিকে ঝুঁকছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মামুনুল হক স্পষ্ট করে বলেননি যে তিনি বিএনপির সঙ্গে যাবেন। আমরা যে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছি, সেখানে তার দলের প্রতিনিধি আছেন। আমরা বারবার বসছি। একসঙ্গে আন্দোলনও করছি।’
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code
আসন সমঝোতার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘আসন সমঝোতার বিষয় আলোচনায় আছে। সবার চাহিদা গুরুত্ব দিয়েই আসন নিয়ে সমঝোতা হবে। সবাই তাদের অগ্রাধিকার এলাকায় প্রার্থিতা নিশ্চিত করবে। তবে এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে সব দলের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর।’
প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবেন যারা
ইসলামি দলগুলোর নির্বাচনি সমঝোতায় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলের আমির কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের বিশেষ বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালউদ্দিন আহমদ।
জালালউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘প্রতিটি আসনে তো দলের চেয়ে প্রার্থীদের অবস্থান কিংবা তার প্রতি এলাকার জনসমর্থনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ছোট ছোট দলের ক্ষেত্রে আমির কিংবা হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় নেতা এলাকায় জনসমর্থন কিংবা পরিচিতিতে পিছিয়ে থাকলেও, প্রার্থী বিবেচনায় তাদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। তা না হলে ঐক্য নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘সব দলের তো সমান সমর্থক নেই। ছোট ছোট দলের সমর্থক কম, এলাকায় তো তাদের অবস্থা ভালো নাও হতে পারে। সেজন্য এসব দলের আমির কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের গুরুত্ব দিতে হবে।’
যেসব ইসলামি দলের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন পর্যন্ত আসন সমঝোতার বিষয়ে আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
Manual3 Ad Code
ইসলামি দলগুলোর সূত্র বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকেই ইসলামি দলগুলো একক ভোটব্যাংক তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে আরেক ইসলামী দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
আবার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করলেও মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসেরও বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার বিষয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যম গুঞ্জন ছড়িয়েছে বিএনপির সঙ্গে আমাদের জোট হচ্ছে, কিন্তু এগুলো বানোয়াট। সেজন্য ২৫ অক্টোবর আমরা দলের মজলিসে শুরা সদস্য ও দলের সাধারণ পরিষদ সদস্যরা মিটিংয়ে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো।’