জাতীয় নির্বাচনের ট্রেন যত এগিয়ে চলছে, ততই গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে সরকারের পুরো প্রশাসনে। নির্বাচনের আগে মন্থরতা এবং অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে সরকারি কাজকর্মে। রুটিন কাজ ছাড়া অন্য কোনো দায়িত্বে আগ্রহ কমছে কর্মকর্তাদের মধ্যে, বেড়েছে রাজনৈতিক আনুগত্য ও পদায়নের হিসাব-নিকাশ। স্পষ্ট হচ্ছে নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের এ মনোভাব। ফলে সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন- সবখানেই তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তা ও স্নায়ুযুদ্ধের আবহ। তবে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচনে সহযোগিতার কাজে মগ্ন। গত কয়েকদিন প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুু সচিবালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসক অফিস ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে দুজন সিনিয়র সচিব বলেছেন, রাজনৈতিক দলের প্রতি কোনো কোনো সচিবের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি দেখা যাচ্ছে। তাদের আদর্শের যেকোনো মানুষের জন্য তদবির করতে তারা এখন সিদ্ধহস্ত। শুধু তাই নয়, কোথায় কার পদায়ন হবে সেদিকেও নজর বেশি। সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেছুর রহমানকে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করার পর প্রায় তিন সপ্তাহ এ পদটি খালি ছিল। এ পদে কে আসবেন তা নিয়ে বেশ কিছু দেনদরবার হয়েছে। এ কারণে এ সচিব পদে পদায়ন দেরি হয়েছে। শেষমেষ সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়।
Manual4 Ad Code
ভালো জায়গায় পোস্টিং নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতদুষ্ট সিনিয়র আমলারা। যারা কোনো ধরনের ভালো পোস্টিং পাচ্ছেন না, তাদের গায়ে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত সাবেক আমলাদের মধ্যেও টানাপড়েন শুরু হয়েছে শুধু তদবির নিয়ে। নির্বাচনের পর কোন দল সরকারে আসে সেদিকে নজর বেশি। যে সব সিনিয়র কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ আর বেশি নেই তাদের লক্ষ্য এ অন্তর্বর্তী সরকার থাকতে লাভজনক কিছু খুঁজে নেওয়া।
Manual4 Ad Code
বিএনপিতে বেশ কয়েকজন সাবেক আমলা অনেক আগে যোগ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি আরও এক সাবেক সিনিয়র সচিব প্রকাশ্যে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। তিনি যোগ দেওয়ার পর প্রশাসনে তার আনাগোনা বেড়েছে। ঘাপটি মারা জামায়াতপন্থি আমলারা দিনে দিনে বিভিন্নভাবে প্রকাশ্যে আসছেন। বিশেষ করে ডাকসু, জাকসু ও সর্বশেষ রাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পর জামায়াতপন্থি আমলাদের মধ্যে বেশ উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।
এদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আমলাদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। রুটিন কাজ শেষ করেই যেন সবাই খালাস। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিবের দফতরে আগে যে পরিমাণ চিঠি আসত তা এখন অনেকাংশে কমে গেছে। দফতরের ডাকফাইল সে সাক্ষ্য বহন করে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো রুমে দেখা যায় কোনো কর্মকর্তা নেই। অথচ শাখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। কোনো কোনো সচিবের রুমে তার অধস্তন অফিসের কর্মকর্তারা বিশেষ কোনো জরুরি প্রয়োজন ছাড়াই গল্পে মশগুল থাকেন। একইভাবে বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কোন কর্মকর্তা কোথায় আছেন তা জানানোর মতো কর্মকর্তা বা কর্মচারী খুঁজে পাওয়া যায় না।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মকর্তাদের মধ্যে যেন অলস দিনের হাওয়া বইছে। কোন দল আগামীতে ক্ষমতায় আসবে- এ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করে সময় পার করছেন। আবার নির্বাচন হবে কি হবে না- এ নিয়েও আলোচনায় সরব দেখা যায়। স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে ফাইল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ দেখা দিলেও তা মন্ত্রণালয়ের কাজের ব্যাপ্তি তুলনামূলক কম। মধ্য পর্যায়ের এক কর্মকর্তা অকপটে স্বীকার করেন- কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সবার মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। গতানুগতিকভাবে চলছে সব।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছাড়া আর কোনো কাজের গতি দেখা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার সেতু বিভাগের বেশিরভাগ প্রকল্পের সমীক্ষার কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। এ কারণে কাজের গতি একেবারে মন্থর। মঙ্গলবার একনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠক থেকে ফেরত গেছে হাওড়ের জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে মূলত প্রবেশের দ্বার হিসেবে কাজ করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। এ শ্রেণির একাধিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন কাজে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তারা কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন সে বিষয়ে মনিটর করার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও উদাসীন। নির্বাচনে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে দেখা যায়। এ শ্রেণির কর্মকর্তার মধ্যেও নির্বাচন হবে কি না- এ নিয়ে যেমন আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনে কারা ক্ষমতায় আসতে পারে সে নিয়েও আলোচনা চলছে।
ঢাকার জেলা প্রশাসক অফিসে প্রতিদিন বিভিন্ন কাজের জন্য মানুষ আসে। একাধিক কর্মকর্তা সারাদিন মিটিংয়ে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, দর্শনার্থীরা কোনো কর্মকতার সহজে দেখা পান না। বিকাল গড়িয়ে গেলে দেখা মিললেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। কোনো কোনো কর্মকর্তা বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অফিসের বাইরে ক্লাস নিতে যান। ক্লাস থেকে ফিরে কাজ করার আর সময় থাকে না। সোমবার আর বুধবার জেলা প্রশাসক অফিসে গণশুনানি হয়। সবার অভিযোগ শোনার সময় হয় না বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলা সফর করেন। এ সময় তিনি একটি কর্মশালায় উপস্থিত হন। সে কর্মশালায় চট্টগ্রাম বিভাগের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ সবার সামনে বলেন, কোন দল ক্ষমতায় যেতে পারে সেটা বিবেচনায় নিয়েই কারও কারও মধ্যে কাজ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। বিগত সরকারের সমর্থকদের নিজেদের তীরে ভেড়াতে প্রায় সব দল উঠে পড়ে লেগেছে।
Manual3 Ad Code
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের আগেই পছন্দের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং নিয়ে দেনদরবার হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। তবে কেউ কেউ নির্বাচনের আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যেতে রাজি নন। ইতিমধ্যে পুলিশ প্রশাসনের কাছে নির্বাচনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে।