চকচকে প্যাকেট, নামি ব্র্যান্ড আর ঝলমলে লেবেলের আড়ালে চলছে নীরব প্রতারণা। ওজনে সামান্য ঘাটতি, কিন্তু তাতেই কোটি টাকার বেআইনি মুনাফা উঠছে কোম্পানিগুলোর ঘরে। ৯০ গ্রামের চানাচুর এখন ৮০ গ্রাম, ১৫ গ্রামের চিপস এখন ১২ গ্রাম- দাম একই, কমছে শুধু ভোক্তার পাওনা। ক্রেতা না জেনেই প্রতিদিন হারাচ্ছেন কয়েক পয়সা, যা যোগ হয়ে বছরে দাঁড়াচ্ছে কোটি টাকায়।
Manual1 Ad Code
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে এই ওজন কারচুপি ভোক্তার বিশ্বাস ও ন্যায্যতার ওপর সরাসরি আঘাত আনছে। তারা বলছেন, ভোক্তাদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও নৈতিকতার জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এক ধরনের ‘গোপন মূল্যবৃদ্ধি’ বা প্যাকেজিং প্রতারণা, যা রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
কোম্পানিগুলোর পণ্যের প্যাকেট ঘেঁটে দেখা গেছে, বম্বে সুইটস কোম্পানি ৯০ গ্রামের চানাচুরের প্যাকেট আগে বিক্রি হতো ৩০ টাকায়। এখন ১০ গ্রাম কমে ৮০ গ্রাম বিক্রি হচ্ছে একই দামে। অর্থাৎ ভোক্তাকে প্রতি গ্রামে শূন্য দশমিক ৩৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে, যা ১০ গ্রামে ৩ দশমিক ৩৩ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়। তেমনি ১৫ গ্রাম ওজনের পটেটু আগে বিক্রি হতো ১০ টাকায়। এখন ৩ গ্রাম কমিয়ে ১২ গ্রাম রাখা হলেও দাম অপরিবর্তিত। ফলে ভোক্তা প্রতি প্যাকেটে ২ টাকা বেশি দিচ্ছেন। চিজবল আগের প্যাকেটে ছিল ১৪ গ্রাম, দাম ১০ টাকা। এখন ওজন কমে দাঁড়িয়েছে ১০ গ্রামে। পুরনো হিসাব অনুযায়ী প্রতি গ্রামে দাম ছিল ০.৭১৪ টাকা। অর্থাৎ ৪ গ্রামে ভোক্তা থেকে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২ টাকা ৮৬ পয়সা।
ধরা যাক, কোনো কোম্পানি প্রতিদিন ৫০ লাখ প্যাকেট চিপস উৎপাদন করছে। প্রতি প্যাকেটে ২ টাকা কম ওজনের কারণে অতিরিক্ত নিলে প্রতিদিন আয় হচ্ছে ১ কোটি টাকা। বছরে এই অঙ্ক দাঁড়ায় ৩৬৫ কোটি টাকা। তেমনি ৮০ গ্রামের ৫০ লাখ চানাচুর প্যাকেটের প্রতিটিতে ৩ টাকা ৩৩ পয়সা অতিরিক্ত নিলে প্রতিদিন কোম্পানির বাড়তি আয় হয় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা বছর শেষে দাঁড়ায় ৬০৭ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, চিজবলের প্রতি প্যাকেটে ২ টাকা ৮৬ পয়সা করে কম দিয়ে ৫০ লাখ প্যাকেট উৎপাদন করলে প্রতিদিন বাড়তি আয় হবে ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, আর বছরে প্রায় ৫২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। কিন্তু প্রাণ ও আকিজ কোম্পানি ১৫ গ্রামের পটেটু ১০ টাকাই বিক্রি করছে। তারা তাদের ওজনে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘ সাত বছর ধরে প্যাকেটজাত পণ্যের সঙ্গে জড়িত রাসেল আহমেদ। পাঁচ বছর বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করলেও দুই বছর যাবত ব্যক্তিগত ছোট প্রতিষ্ঠান চালান। তিনি বলেন, আগের চেয়ে প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ছে। আর যেসব পণ্যের দাম বাড়েনি, সেগুলার ওজন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
Manual7 Ad Code
রাজধানীর কুড়িলে চায়ের দোকানি মোহাম্মদ জনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখন প্রতিটা জিনিসে দাম বেশি। চিপস ও অন্যান্য পণ্য যে দামে কিনতাম এখন তার দাম বেড়ে গেছে। আগের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে।
দোকানে দুজন শিশুকে নিয়ে তাদের পছন্দমতো প্যাকেটজাত পণ্য কিনছেন আজিজুর রহমান। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ভাগিনা ও ভাতিজা বায়না করছে চিপস কেনার জন্য। তাই তাদের নিয়ে আসছি। চিপসের ওজন কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা তো এগুলা খেয়াল করি না। সর্বোচ্চ মেয়াদটা দেখি।
Manual4 Ad Code
আছিয়া বেগম নামের এক গৃহিণী বলেন, চিপসের প্যাকেটে সাইজ একই আছে কিন্তু ভেতরে বাতাসে ভরা। খুললে ১০টা খণ্ডও পাওয়া যায় না। মঙ্গলবার বম্বে সুইটস কোম্পানিতে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, এ বিষয়ে যিনি কথা বলবেন তিনি ট্যুরে আছেন। পরের দিন বুধবার আবার কোম্পানির ফন্ট ডেস্কে কল দিয়ে যোগাযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে এইচআর থেকে জানানো হয় যে, এ বিষয়ে কথা বলবে তার কাছে আমার (সাংবাদিক) নাম্বার পাঠানো হয়। পরে দুপুর ২টার দিকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (সাবেক) পদমর্যাদার রবিউল ইসলাম নামের একজন হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে বলেন, তিনি বম্বে সুইটস কোম্পানির উপদেষ্টা। আপনার কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে বলতে পারেন। ১৫ গ্রাম চিপসে কমানোর ব্যাপারে জিজ্ঞসা করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে। সরাসরি কথা বলবেন। পরবর্তীতে শুক্রবার রাতে কখন সময় দিতে পারবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামীকাল (শনিবার) আমি ঢাকার বাইরে থাকব, ২ কিংবা ৩ দিন পর আপনাকে জানাতে পারব।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ সালের ২৬নং এর (৪৬)-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে উক্ত পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ (৫০) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। আর বিএসটিআইর পণ্য মোড়কজাত বিধিতে বলা আছে, প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, পণ্যের পরিমাণ, উৎপাদন তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, মূল্য এবং পণ্যের উপাদানগুলো উল্লেখ করতে হবে। কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে ব্যত্যয় ঘটলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা ২ মাসের জেলের বিধান রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, কম পণ্য দিয়ে বেশি টাকা নেওয়া অসৎ উপায়। এতে ভোক্তারা ঠকছেন, আর ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফা করছেন।
Manual2 Ad Code
বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, যারা এসব অনিয়ম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে সবকিছু নজরদারি করা সম্ভব নয়, এজন্য ভোক্তা ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইন্দ্রানী রায় বলেন, কোনো পণ্যের প্যাকেটে যদি ঘোষিত দাম দেওয়া থাকে, তবে সে দামে কোম্পানি কম বা বেশি দিচ্ছে কি না, সেটি তাদের নীতিগত বিষয়। তবে যদি প্যাকেটে লেখা ওজনের চেয়ে কম দেওয়া হয়, সেটি ভোক্তা অধিকারের আওতায় পড়ে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাংলাদেশের বাজারে ভোক্তারা নিয়মিতভাবে দাম, মান ও ওজনে প্রতারিত হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন অথচ ওজনে কম দিচ্ছেন এবং মানহীন পণ্য বাজারে ছাড়ছেন। বিএসটিআই মান সনদ দিলেও কার্যকর তদারকির অভাবে এসব অনিয়ম থামছে না।