বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে বিদেশি কূটনীতিকরা। তাদের প্রত্যাশা, আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠান অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক এবং সহিংসতামুক্ত হবে। ভোটের পরিবেশ আগাম বোঝার জন্য ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরা এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে।
চলতি অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী অ্যান অ্যালি ঢাকা সফর করেন। মূলত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার সম্পৃক্ততা জোরদার করা এবং ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করাই ছিল তার সফরের মূল উদ্দেশ্য। এই সফরে তিনি ‘অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ প্ল্যান ২০২৫-২০৩০’ উদ্বোধন করেন। সফর শেষে তিনি ঢাকা থেকে দিল্লি যান। ঢাকার অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশন জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানায় এবং এ প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক উপমন্ত্রী জোহান সাথফ আগামী ২৭ অক্টোবর দুদিনের সফরে ঢাকায় আসছেন। এটি জার্মানির পক্ষ থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের সফর হতে যাচ্ছে। এর আগে জার্মান সংসদ সদস্য বরিস মিজাতোভিচ ২৬-২৮ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশ সফর করবেন। এর আগে জার্মানির একটি প্রতিনিধি দল গত ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর শেষ করেছে। জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের নিয়ে এই প্রতিনিধি দলে সরকারি-বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং শিক্ষাবিদ, ফেডারেল একাডেমি ফর সিকিউরিটি পলিসির সদস্যরা ছিলেন। ঢাকার জার্মান দূতাবাসের মতে, জার্মানি ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে এসব সফর হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্রে পারস্পরিক উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগগুলো অন্বেষণ করা হচ্ছে।
ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লটজ গত ২৩ অক্টোবর নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লটজ সাংবাদিকদের বলেন, আগামী বছর বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবে। এখানে ১২ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ইচ্ছা প্রকাশ করার জন্য ভোট দেওয়ার অনুমতি পাবেন। আর এর মাধ্যমে দেশটি এশিয়া ও বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গনে আবারও যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আঞ্চলিকভাবে এবং বৈশ্বিক গণতন্ত্রের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। এই নির্বাচন কমিশন এই বিশাল চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি নেওয়ায় অত্যন্ত ভালো কাজ করছে। আমি তাদের শুভকামনা জানাই এবং বাংলাদেশের জনগণকে শুভকামনা জানাই গণতন্ত্রে ফিরে আসার এই যাত্রায়। আমরা মনে করি, দেশের একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রয়োজন। এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন যাতে বিভিন্ন দল অংশগ্রহণ করতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মান মন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চলমান সময়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সামনের নির্বাচন কেমন হবে সে বিষয়ে ধারণা নেওয়া। কেননা বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পশ্চিমারা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
গত ৫ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূত ব্যারোনেস রোজি উইন্টারটন (ডনকাস্টার) পাঁচ দিনের সরকারি সফরে ঢাকায় আসেন। ওই সফরের মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন গুরুত্ব পায়। ঢাকা সফরে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূত ব্যারোনেস রোজি উইন্টারটন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের অংশীদারত্বের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এসব বৈঠকে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানও আলাপ হয়। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনা করা।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপ-কমিটির একটি প্রতিনিধি দল গত আগস্টে ঢাকা সফর করেন। ওই সফরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলের নেতা মৌনির সাতুরি বলেন, ‘২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে অবশ্যই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের নির্বাচনের ফলাফলকে সবাই সম্মান করতে হবে। নির্বাচনের পর বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার জন্য এটি অপরিহার্য শর্ত। ক্ষমতা পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনপরিসর ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্র ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের সঙ্গে কাজ করবে।’ জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, জুলাই সনদ ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এই দলিল মৌলিক সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা ব্যাপক ঐকমত্যের প্রতিফলন। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পথে দেশটি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এটি তারই প্রমাণ।
Manual8 Ad Code
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতের নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের সঙ্গে নিউইয়র্কে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়েছে। ওই বৈঠক সম্পর্কে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ইতিবাচক সাক্ষাৎ হয়েছে। এই সাক্ষাতে প্রধান উপদেষ্টা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেন। এই সাক্ষাতে উভয় পক্ষ আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।
Manual7 Ad Code
ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং গত ৯ অক্টোবর রাজনৈতিক দল এবি পার্টির সঙ্গে এবং গত ১৬ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেন এবং বৈঠক করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কানাডার দূতের এসব বৈঠকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়। এ ছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেও নির্বাচন প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছিল। এ ছাড়া চীন বাংলাদেশের একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের তাদের দেশ ভ্রমণ করিয়েছে। সেখানেও নির্বাচন প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) আসন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পর্যবেক্ষক পাঠাবেন বলে জানিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বিশ্বের সবাই সামনের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। বিদেশি কূটনীতিকদের মতে, ‘যত দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে যতই মঙ্গল। কেননা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসলে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। শুধু তাই নয়, দেশে স্থিতিশীলতা বিরাজের পূর্বশর্ত হচ্ছে সঠিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সরকার পরিচালনবা করা। এ ছাড়া নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেই বিদেশিরা বিনিয়োগে আগ্রহ পায়। তাই সামনের ভোট অনুষ্ঠান অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, বিদেশিরা মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচন অনুষ্ঠান এগুলো নিয়ে কথা বলার কারণ হচ্ছে এই দেশে তাদের বিনিয়োগ আছে। তারা চায় না যে তাদের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বিদেশিরা এ জন্য স্থিতিশীলতা চায়। স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত থাকে। এ জন্য তারা গণতান্ত্রিক বা নির্বাচিত সরকারকে পছন্দ করে।