প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

নিয়ন্ত্রণ নেই শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ
নিয়ন্ত্রণ নেই শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

রাজধানীর একটি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিসকক্ষে শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, অফিসকক্ষে স্কুলের পোশাক পরা শিশুটিকে প্রথমে এক নারী চড় দিলেন। এরপর শিশুটির ওপর চড়াও হলেন আগে থেকেই অফিসকক্ষে থাকা এক পুরুষ। ওই পুরুষ কখনো শিশুটির গলা চেপে ধরছিলেন, কখনো মুখ চেপে ধরছিলেন। হাতে স্ট্যাপলার ছিল। শিশুটি কখনো কাঁদছিল, কখনো অস্থির হচ্ছিল। ওই নারী হাত ধরে তাকে আটকে রাখছিলেন। একপর্যায়ে শিশুটি ওই নারীর শাড়িতে থুথু ফেললে পুরুষটি শিশুটির মাথা শাড়িতে থুথু ফেলার জায়গায় চেপে ধরেন এবং সেই অবস্থায় কয়েকবার শিশুর মাথায় ঝাঁকি দেন।

 

ঘটনাটি ১৮ জানুয়ারি নয়াপল্টন এলাকার মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে ঘটেছে। শিশুটি ওই এলাকায় বসবাস করা দম্পতির একমাত্র সন্তান। স্কুলে প্রি-প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এমন নির্যাতনের শিকার হয় সে। নির্যাতনের ভিডিও দেখে ছেলেটির বাবা-মা হতভম্ব। এ ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন স্কুল আবারও আলোচনায় এসেছে। লাগামহীনভাবে চলা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও এর ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, দেশে কতগুলো কিন্ডারগার্টেন আছে কিংবা এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত কিছুই জানা নেই সরকারের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো কোনো কিন্ডারগার্টেনে বিদেশি পাঠ্যক্রম অনুসরণ করায় অগ্রাহ্য হচ্ছে দেশের ভাষা-ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পূর্ণই। এসব স্কুলে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাড়াও সহায়ক বইয়ের বাড়তি চাপে থাকে শিশুরা। এ ছাড়া ‘গলাকাটা’ টিউশন ও সেশন ফি আদায় করে রমরমা শিক্ষাবাণিজ্য চালাচ্ছে কিন্ডারগার্টেনগুলো।

Manual2 Ad Code

 

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, খিলগাঁও, লক্ষ্মীবাজার, ওয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকায় সারি সারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। খিলগাঁওয়ে এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪৫টির মতো কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এবং ওয়ারী এলাকায় ডজনখানেক কিন্ডারগার্টেন আছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীবাজারের নবদ্বীপ বসাক লেনের গলিতে রয়েছে পাঁচটি। কোনো কোনো এলাকায় একই ভবনে রয়েছে একাধিক কিন্ডারগার্টেন স্কুল। রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম মণিপুরে এডু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নামে একটি কিন্ডারগার্টেনের এক বাড়ি পরই দিগন্ত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নামে আরেকটি কিন্ডারগার্টেন। অভিযোগ আছে, এভাবে রাজধানীসহ সারা দেশে নিয়মনীতি ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো কিন্ডারগার্টেন বানিয়ে চলছে রমরমা শিক্ষাবাণিজ্য।

Manual4 Ad Code

 

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠদান করাচ্ছে ১ লাখ ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৪৯ হাজারের বেশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে এগুলোর সিংহভাগই নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে।

 

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা ২০২৩ অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদান করানো কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে নিবন্ধিত হতে হবে। তবে নিবন্ধিত হওয়ার আগে এ স্কুলগুলোকে নিতে হবে পাঠদানের অনুমতি।

Manual6 Ad Code

 

ওই বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অবস্থানভেদে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা ফি দিয়ে এ স্কুলগুলোকে এক বছরের জন্য পাঠদানের অনুমতি নিতে হবে। পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার ১১ মাস ৩০ দিন পর কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে নিবন্ধিত হওয়ার আবেদন করতে হবে।

 

নিবন্ধন নিতে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থানভেদে ফি ছিল ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা। নিবন্ধন বা নিবন্ধন সনদের মেয়াদ হবে ৫ বছর। নিবন্ধিত হওয়ার পাঁচ বছর পর নিবন্ধন ফিয়ের অর্ধেক টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরের পাঁচ বছরের জন্য নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে।

 

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করানো নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, প্রিপারেটরি স্কুল, ইংরেজি ভার্সন স্কুল, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংযুক্ত পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলগুলোকে এ বিধিমালার আলোকে পাঠদানের অনুমতি নিয়ে নিবন্ধিত হতে বলা হয়েছিল বিধিমালায়।

 

বিধিমালা অনুসারে প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদান করানো কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে ছয়জন শিক্ষক থাকতে হবে। তাদের কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্ডারগার্টেনসহ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা হবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো। বেসরকারি এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত হবে ৩০ : ১।

 

নিয়োগ যোগ্যতা বেঁধে দেওয়া হলেও এ বিধিমালায় শিক্ষকদের বেতন কত হবে সে বিষয়ে কোনো শর্ত বা নির্দেশ ছিল না। কিন্তু সরকারি নীতিমালা থাকার পরও নিবন্ধন ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল। শহরকেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সারা দেশে দিন দিন কেজি স্কুলের প্রসার পাচ্ছে। গত দুই দশকে এই স্কুলগুলোর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এদের মধ্যে আছে ইংরেজি ও জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী চলা স্কুল। এগুলো চলছে অনেক ক্ষেত্রেই দোকানের আদলে মালিকের ইচ্ছেমতো। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ইচ্ছেমতো টাকা নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকবিহীন এসব স্কুলের শিক্ষকদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগেও মান নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার মান নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। ফলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।

 

এসব প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছেমতো বিভিন্ন শ্রেণিতে পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের নির্ধারিত তিনটির বাইরে আরও ৬ থেকে ১০টি বই দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বোর্ডের বাংলা, ইংরেজি, গণিত এ তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে ধর্ম, পরিবেশ পরিচিতি, বিজ্ঞান, ওয়ার্ড বুক, চিত্রাঙ্কন, বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা শেখার, সাধারণ জ্ঞান, নামতা-গুণ-ভাগ-জ্যামিতি আছে এমন একটি গণিত বই, ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, গল্প ও কবিতার এবং কম্পিউটার শিক্ষা সংক্রান্ত বই দেওয়া হয়ে থাকে। স্কুলভেদে এসব বইয়ের সংখ্যা ও বিষয় কমবেশি হয়ে থাকে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম ছয়টি সরকারি বইয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে দেওয়া হয় ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কন, দ্রুতপঠন ধরনের দুই থেকে ছয়টি বই।

 

বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বোর্ডের বাংলা, ইংরেজি, গণিতের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে ধর্ম, পরিবেশ পরিচিতি, বিজ্ঞান, ওয়ার্ড বুক, চিত্রাঙ্কন, বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা শেখার, সাধারণ জ্ঞান, নামতা-গুণ-ভাগ-জ্যামিতি আছে এমন একটি গণিত, ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, গল্প ও কবিতার এবং কম্পিউটার শিক্ষা সংক্রান্ত বই দেওয়া হয়ে থাকে। স্কুলভেদে এসব বইয়ের সংখ্যা ও বিষয় কমবেশি হয়ে থাকে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম এ ছয়টি সরকারি বইয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে দেওয়া হয় ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কন, দ্রুতপঠন ধরনের দুই থেকে ছয়টি বই।

 

Manual2 Ad Code

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আহাম্মেদ বলেন, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির সময়। এ সময়টাতে শিশুদের হাড় ও মাংসপেশি অপরিণত ও নরম থাকে। ভারী স্কুলব্যাগ নিয়ে বাচ্চাদের সিঁড়ি বেয়েও উঠতে হয়। এতে ঘাড় সামনে বা পেছনের দিকে কুঁজো হয়ে যায়। তিনি বলেন, ভারী স্কুলব্যাগ বইতে শিশুদের ঘাড়, পিঠ ও মাথাব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট ও মেরুদণ্ড বাঁকাও হয়ে যেতে পারে। এমনকি শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

 

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক যেকোনো শাস্তি নিষিদ্ধ। এটি আইনগত অপরাধ। এ বিষয়ে কোনো মনিটরিং নেই। আমরা শিশুদের আনন্দের শৈশব থেকে বঞ্চিত করছি।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code