দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অধিকাংশই তরুণ। প্রায় ৩৩ শতাংশ ৮-১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক সেবন করেছেন। ৫৯ শতাংশ প্রথম সেবন করেছেন ১৮-২৫ বছর বয়সে। সংখ্যার দিক থেকে বেশি মাদক সেবনকারী ঢাকায়; ঢাকা ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন। দ্বিতীয়, চট্টগ্রাম ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন। তৃতীয়, রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন। এরপর পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহ ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২, খুলনা ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০, রাজশাহী ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯, সিলেট ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ ও বরিশালে ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন। সব মিলেয়ে দেশ ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন মাদক সেবন করে। এই গবেষণায় সিগারেটকে মাদক সেবন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
Manual2 Ad Code
দেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান হয়। গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করে। গবেষণায় দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তার ভিত্তিতে ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
Manual5 Ad Code
প্রায় ৮২ লাখ সেবনকারীর কে কোন ধরনের মাদক গ্রহণ করেন গবেষণায় তা আলাদা করে দেখা হয়েছে। কেউ কেউ একাধিক মাদক সেবন করেন। কেউ শুধু এক ধরনের মাদক সেবন করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মানুষ গাজা সেবন করেন। এরা অন্য মাদকও সেবন করেন। গাজা সেবনকারীর সংখ্যা ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৪ জন। ইয়াবা ২২ লাখ ৯২ হাজার ৭০৫, অ্যালকোহল ২০ লাখ ২০ হাজার ৯৭৭, কোডিন ফসফেট (কফ সিরাপ) ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬০, হেরোইন ৩ লাখ ২২ হাজার ৬৭৭, ঘুমের ওষুধ ৩ লাখ ৫ হাজার ৬৯৪, ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৪৭ ইনহেল্যান্ট (যেমন: আঠা, পেইন্ট থিনার) এবং ৩৯ হাজার ৬১ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক, ১১ হাজার ৮৮৮ ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ৫ হাজার ৯৫ এলএসডি এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৪ জন্য অন্যান্য মাদক সেবন করেন।
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক সেবনকারীদের এইচআইভি, হেপাটাইটিস ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় জানানো হয়, একজন মাদকসেবী মাসে কমবেশি ৬ হাজার টাকা ব্যয় করেন। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক সেবনের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ সেবনকারী মাদক সহজলভ্য বলে জানিয়েছেন।
দেশে মাদক ব্যবহারকারী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ খুবেই সীমিত। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক সেবনকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি সেবনকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, কাউন্সেলিং, সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সফল হতে পারেননি। মাদক সেবনকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা (৬৯%), কাউন্সেলিং (৬২%) এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে (৪১.২%) সবচেয়ে জরুরি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৬৮ শতাংশ সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। প্রধান গবেষক (প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর) হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।
বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম মাদক প্রতিরোধে পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট এবং আরও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এটা ভাবার কারণ নেই যে কিছু সংখ্যক খারাপ মানুষ মাদকাসক্ত এবং আমরা বা আমাদের সন্তানরা মাদক থেকে দূরে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা বা আমাদের সন্তানেরা মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছি। সবাইকে সচেতন হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবেই এই ঝুঁকিকে মোকাবিলা করতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, একটি সামাজিক যুদ্ধের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। মাদক নির্মূলে পরিবার থেকেই হোক প্রতিরোধ তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার মাদকাসক্তদের চিকিৎসা বিস্তারে ৭টি বিভাগে ২০০ শয্যা করে ৭টি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালুুর প্রকল্প পাস করেছে।
Manual7 Ad Code
বিএমইউর সম্মানিত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক ড. মো. তাজুল ইসলাম, কো-ইনভেস্টিগেটর ফোরকান হোসেন, বিএমইউর পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক (সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল) ডা. মো. শাহিদুল হাসান বাবুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।