আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কারাগারে বা আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি তারা গণভোটেও অংশ নিতে পারবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও ২৫ জন সাবেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্যসহ ৪৯ জন ভিআইপি বন্দি ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মেয়র, দাপুটে আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাও ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
Manual1 Ad Code
কারা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, দেশের ৭২টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৮৭ হাজারের কাছাকাছি। ভোট দেওয়ার জন্য এদের মধ্যে নিবন্ধন করেছেন ছয় হাজার ৩১৩ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে সাতজন আগ্রহ দেখিয়েছেন ভোটে।
আবার ৩৫৩টি নিবন্ধন আবেদন নাকচ করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ৮৭ হাজার বন্দি থাকলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ৫ হাজার ৯৬০ জন। এদের মধ্যে আবার প্রায় ৩০০ জন নিবন্ধন করার পর জামিনে বাইরে আছেন। পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করলে সরাসরি ভোট দেওয়া যায় না বলে তারাও ভোট দিতে পারছেন না।
কারাগারের সাত বিভাগ এবং ঢাকার দুই বিভাগসহ মোট ৯ বিভাগ থেকে সারাদেশে ৪ হাজার ৭৫৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিবন্ধন করেছেন।
যে কারণে ভোটে আগ্রহ কম বন্দিদের
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, অর্ধেকের মতো বন্দির জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কপি নেই। এনআইডি কার্ড সঙ্গে না থাকায় নিবন্ধন করতে পারেননি।
এই কর্মকর্তার ভাষ্য, যারা কার্ডের নম্বর জানেন তাদের অনেকে নিবন্ধন করতে চাননি নিজেদের আড়াল করে রাখতে। অনেকে মনে করেন কারাগারে ভোট দেওয়া মানে নির্বাচন কমিশনের অফিসে তথ্য চলে যাওয়া। তারা গোপনেই থাকতে চান, প্রকাশ্যে আসতে চান না।
তৃতীয় যে কারণ তার কথায় উঠে এসেছে সেটি হলো— কারাগার থেকে যারা ভোটের জন্য নিবন্ধন করবেন তারা জামিন হলে বাইরে গিয়ে আর ভোট দিতে পারবেন না। ভোট দিতে হলে আবার কারাগারে ঢুকতে হবে। আসামিদের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগ সাজাপ্রাপ্ত, তারাও ভাবেন জামিনে মুক্তি পাবেন। এই চিন্তা থেকে তারা নিবন্ধন করেননি।
অন্যদিকে জামিনে মুক্তি একজন আসামি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে জানান, কারাগারে বন্দিদের মধ্যে বড় অংশই এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। যেহেতু দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না, তাই তাদেরও ভোটে আগ্রহ কম।
মন্ত্রী-এমপিসহ ৪৯ ভিআইপির নিবন্ধন
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা নিবন্ধনে অনাগ্রহ দেখালেও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। সাবেক সরকারের প্রশাসনে উচ্চপদে থাকা সচিবদেরও অনেকের নামে নিবন্ধন হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২৫ জন এমপি-মন্ত্রীসহ ৪৯ জন ভিআইপি বন্দি ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
Manual1 Ad Code
সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা হলেন— শাজাহান খান, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, ডা. দীপু মনি, আসাদুজ্জামান নূর, ইমরান আহমদ, মো. আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, ডা. এনামুর রহমান ও শাহজাহান ওমর।
সাবেক এমপিরা হলেন— শাহে আলম, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, সাদেক খান, আব্দুল মজিদ খান, সিরাজুল ইসলাম মোল্যা, রইস উদ্দিন, আমিরুল আলম মিলন, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামুদ্দীন, রহিম উল্লাহ, আ ক ম সরোয়ার জাহান, মো. নবী নেওয়াজ, আব্দুল আজিজ, সাদ্দাম হোসেন পাভেল, মো. ফয়জুর রহমান বাদল ও মো. চয়ন ইসলাম।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এসকে) সুরও আছেন নিবন্ধন করা বন্দিদের তালিকায়।
সাবেক সচিবদের মধ্যে আছেন হেলালুদ্দীন আহমেদ, মো. শাহ কামাল, মেজবাহ উদ্দিন, মোস্তফা কামাল উদ্দিন ও এনএম জিয়াউল আলম।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম ও এ কে এন নাহিদুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শহিদুল্লাহ, সাবেক পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন ফারুকী ও আব্দুল মান্নান, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিন, শাহ মো. মশিউর রহমান,ইশতিয়াক আহম্মেদ ও অনির্বাণ চৌধুরী নিবন্ধন করেছেন।
কোন কারাগারে কত নিবন্ধন
কারাগারের সাংগঠনিক কাঠামোতে ঢাকা বিভাগ দুটি ভাগে বিভক্ত। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারসহ ১০টি কারাগার ঢাকা বিভাগ-১-এর আওতাভুক্ত। গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারসহ ১০টি কারাগার ঢাকা বিভাগ-২-এর আওতাধীন।
ঢাকা বিভাগ-১-এর আওতায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ হাজার ৫৮ জন, বিশেষ কারাগারে ৮৯ জন, রাজবাড়ীতে ৯৬ জন, নারায়ণগঞ্জে ৮৮ জন, ফরিদপুর জেলা কারাগারে ৫২ জন, গোপালগঞ্জে ৩৩ জন, মুন্সীগঞ্জে ২৭ জন, মাদারীপুরে ২৬ জন ও শরীয়তপুরে ৭ জন নিবন্ধন করেছেন। সব মিলিয়ে এই বিভাগে সংখ্যাটি ১ হাজার ৪৭৬ জন।
ঢাকা বিভাগ-২-এর আওতায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে ৬২৯ জন, কাশিমপুর-১-এ ১৬১ জন, কাশিমপুর-২-এ ১৪১ জন, কাশিমপুর মহিলা কারাগারে ৬০ জন, টাঙ্গাইলে ৮১ জন, গাজীপুরে ৩৪ জন, মানিকগঞ্জে ৩৪ জন, নরসিংদীতে ২৮ জন ও কিশোরগঞ্জে ১৫ জন নিবন্ধন করেছেন। সব মিলিয়ে এই বিভাগে সংখ্যা ১ হাজার ১৮৩ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩৭৮ জন, কুমিল্লায় ৩২৪ জন, কক্সবাজারে ৬০ জন, বান্দরবানে ৫২ জন, ফেনী-১-এ ৫২ জন, নোয়াখালীতে ৪৪ জন, চাঁদপুরে ৩৩ জন, লক্ষ্মীপুরে ১৮ জন, খাগড়াছড়িতে ১৬ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৪ জন, রাঙ্গামাটিতে ৮ জন এবং ফেনী-২-এ তিনজন নিবন্ধন করেছেন। এই বিভাগে নিবন্ধন করা বন্দির সংখ্যা এক হাজার দুইজন।
Manual4 Ad Code
খুলনা বিভাগে খুলনা জেলা কারাগারে ১৭৪ জন, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১২৯ জন, সাতক্ষীরায় ৮৬ জন, ঝিনাইদহে ৬৫ জন, কুষ্টিয়ায় ৬০ জন, মাগুরায় ৫৪ জন, বাগেরহাটে ৩৭ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৩২ জন, নড়াইলে ২৯ জন ও মেহেরপুরে ১৪ জন নিবন্ধন করেছেন। সব মিলিয়ে এই বিভাগে সংখ্যাটি ৬৮০ জন।
রংপুর বিভাগে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১১৯ জন, দিনাজপুর জেলা কারাগারে ৮১ জন, গাইবান্ধায় ৩০ জন, নীলফামারীতে ২৫ জন, লালমনিরহাটে ১৯ জন, পঞ্চগড়ে ১৮ জন, কুড়িগ্রামে ১২ জন ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১১ জন নিবন্ধন করেছেন। সব মিলিয়ে এই বিভাগে সংখ্যাটি ৩১৫ জন।
রাজশাহী বিভাগে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৭৩ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে ১০৬ জন, পাবনায় ৯০ জন, বগুড়ায় ৮০ জন, জয়পুরহাটে ৫২ জন, নাটোরে ৪১ জন, নওগাঁয় ৩৫ জন, সিরাজগঞ্জে ১২ জনসহ মোট ৬৮৯ জন নিবন্ধন করেছেন।
বরিশাল বিভাগে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৫৪ জন, ভোলায় ৩৫ জন, পিরোজপুরে ২৩ জন, বরগুনায় ১৯ জন, পটুয়াখালী জেলা কারাগারে ১৭ জন, ঝালকাঠিতে ছয়জনসহ মোট ২৫৪ জন বন্দি নিবন্ধন করেছেন।
ময়মনসিংহ বিভাগে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে ৮২ জন, নেত্রকোনায় ৪৫ জন, শেরপুরে ১৭ জন ও জামালপুর জেলা কারাগারে ১১ জনসহ মোট ১৫৫ জন বন্দি নিবন্ধন করেছেন।
Manual2 Ad Code
সিলেট বিভাগে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ২৪৭ জন, সিলেট-২-এ ৪৭ জন, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে ১৮৮ জন, সুনামগঞ্জে ৫২ জন ও মৌলভীবাজারে ৩৪ জনসহ মোট ৫৬৮ জন বন্দি নিবন্ধন করেছেন।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট কবে, কীভাবে
কারাগারগুলোতে ব্যালট পেপার আসা শুরু হয়েছে জানিয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, আজ সকাল থেকে ভোটের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারিও ভোট দেওয়া যাবে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন বন্দিরা। নিবন্ধন যারা করেছেন তারা প্রত্যেকে একটি প্যাকেটে তিনটি করে খাম পাবেন। প্যাকেটে নির্দেশাবলিসহ একটি খামে থাকবে ব্যালট পেপার, অপর খামে থাকবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের ব্যালট পেপার। বড় একটি খামে এই দুই ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে আঠা লাগিয়ে দিতে হবে। এই আঠা লাগানোর পর খাম ছেড়া ছাড়া খোলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন বন্দিরা। কারা কর্তৃপক্ষ সেগুলো পোস্ট অফিসে পাঠাবেন। ডাক বিভাগ এক্সপ্রেস ব্যবস্থায় খামগুলো নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় জমা পড়া ভোটের সংখ্যা যুক্ত করবে।
নিবন্ধন আবেদন বাতিলের বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, সঠিক তথ্য না দেওয়ার কারণে এটি হয়েছে। একাধিক এনআইডি, এনআইডিতে ভুলসহ একাধিক কারণেও নিবন্ধন বাতিল হয়েছে।