জানুয়ারি মাস চলে গিয়ে ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে গেছে। এখনো ভোক্তাদের বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) কিনতে হচ্ছে। রাজধানীতে আড়াই হাজার টাকার কমে মিলছে না ১২ কেজির সিলিন্ডার। বেশি দাম নেওয়ায় সড়কে বিক্ষোভও করছেন ভুক্তভোগীরা।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলাররা বেশি দাম নেওয়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ডিলাররা বলছেন, গ্যাস কোম্পানি থেকে বেশি দাম নিচ্ছে। সঙ্গে গাড়ি ভাড়াও বেশি দিতে হচ্ছে। এ জন্য ১ হাজার ৩৫৬ টাকার গ্যাস ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে এলপি গ্যাস কোম্পানিগুলো বলছে এক টাকাও বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। চাহিদার ৮০ শতাংশ আমদানি হয়েছে জানুয়ারি মাসে। ২০ শতাংশ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে ভোক্তাদের গলা কাটছে অসাধু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা। গত মাসে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। বাজারে অভিযান চালালে তাদের এ অপতৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ভোটের হওয়ায় চাপা পড়ে গেছে গ্যাসসংকট ইস্যু। এর ফলে বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে এলপিজি। গতকাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
খিলগাঁও এলাকার আলী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. কামাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মানিকনগরের এলপি গ্যাসের ডিলার আলাবি এন্টারপ্রাইজ ও অন্য দোকানে যখন এলপি গ্যাস পাই, তখন তা নিয়ে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করি। কিন্তু গত মাস থেকে এলপি গ্যাসসংকট শুরু হওয়ায় ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। আবার দুই-চারটা পেলেও ১ হাজার ৯০০ টাকায় কিনে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছি।’
কিন্তু অনেক এলাকায় এই দামেও এলপি গ্যাস পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগীরা জানান, ২ হাজার ৫০০ টাকাতেও অনেক জায়গায় পাওয়া যায় না। কোথাও কোথাও ৪ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ভোটের চাপে এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। ভোক্তা অধিদপ্তরের কোনো অভিযান দেখা যায় না। মানিকনগরের গোলাম মাওলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিত্যপণ্যের মতো এলপি গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে। গত মাসে হুট করে দাম বেড়ে গেল। আমাদের ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। অথচ ভোক্তা অধিদপ্তর চুপ করে বসে আছে। ভোটের হাওয়ায় সব চাপা পড়ে গেছে।’
এলপি গ্যাসের বেশি দাম নেওয়ায় গত সোমবার শনির আখড়া ও রায়েরবাগ এলাকায় সড়কে বিক্ষোভ করেন ভুক্তভোগীরা। শহিদুল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, সড়কে বিক্ষোভ অনেক ক্ষণ ধরে চলে। এ সময় যানজট বেঁধে যায়। ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’
Manual7 Ad Code
এদিকে সরকারি কর্মকর্তারাও এলপি গ্যাসের বাড়তি দাম নেওয়ায় চরমভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপসচিব বলেন, ‘ সরবরাহের ওপর বাজারে পণ্যের দাম নির্ভর করে। কিন্তু এলপি গ্যাসের দাম তো সরকার নির্ধারিত। তবে গত এক মাস থেকে এমন সংকট শুরু হয়েছে, যে-যার মতো দাম নিচ্ছে। আমাকেও ২ হাজার ২০০ টাকায় কয়দিন আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। অনেকের কাছে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। এভাবে চলতে পারে না। একটা সুরাহা হওয়া দরকার।
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, সংকট এখনো কাটেনি। বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে। তাই সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের পেট্রোম্যাক্সের ডিলার সোহেল এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গ্যাসসংকট লেগেই আছে। এখনো চাহিদামতো পাই না। ২ থেকে ৪ দিন পর এক গাড়ি (৬১৫টি সিলিন্ডার) পেলেও কোম্পানি থেকে বেশি দাম নিচ্ছে। এ জন্য নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে পোষায় না। আবার গাড়ি ভাড়াও বেশি দিতে হচ্ছে। তাই ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’
একই তথ্য জানান ওই এলাকার আরেক ডিলার এমএন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. রমজান আলী। তিনি বলেন, ‘পেট্রোম্যাক্স কোম্পানির কাছে যে ডিও করেছি তাতে প্রতি সিলিন্ডারে গাড়িভাড়াসহ ১ হাজার ৩৯২ টাকা লেগেছে। আবার চাহিদামতো পাওয়া যায় না। তা দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোম্পানি থেকে বলা হচ্ছে, এ মাসের মাঝামাঝিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।’
তাদের অভিযোগের ব্যাপারে এলপিজি গ্যাস কোম্পানির সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ এর (লোয়াব) এর সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদ বলেন, ‘সরকার তথা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়। আমরা সেই দামে ডিলারদের কাছে গ্যাস বিক্রি করি। লোয়াবের কোনো সদস্য বেশি দামে বিক্রি করতে পারে না। সেই সুযোগ নেই। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কিছুটা আমদানি কম হয়েছে। সেই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা ভোক্তাদের কাছে বাড়তি টাকা নিচ্ছে। এটা ভোক্তা অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখা দরকার।’
জানা গেছে, সারা দেশে জ্বালানির কাজে এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে আমদানিকারক কোম্পানি ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডসহ আরও অনেক কোম্পানি বেশি করে আমদানির অনুমতি চাইলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। এর ধাক্কা লেগেছে দেড় বছর পর। রাজধানীতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের চাহিদা আরও বেড়ে গেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হয়েছে এই সংকট। গত মাসে তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
Manual2 Ad Code
লোয়াব ও বিইআরসি থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন। দিনে কম-বেশি ৫ হাজার টন এলপিজি লাগে। ১ টনে ১২ কেজির ৮৩টি সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হয়। ৪ লাখ ১৫ হাজার সিলিন্ডারে ৫ হাজার টন গ্যাস ধরে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করেন। প্রতি সিলিন্ডারে গড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সে হিসাবে তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে গত মাসে লুটপাট করেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
Manual2 Ad Code
লোয়াবের সাধারণ সম্পাদক এহসানুল জব্বার বলেন, ‘ডিসেম্বরে লোয়াবের সদস্যরা ১ লাখ ১৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে। জানুয়ারিতে বেড়ে ১ লাখ ২৬ হাজার টন হয়েছে। এটা মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ। মানে ২০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এটার কারণে এক শ্রেণির অসাধু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা বেশি দাম আদায় করছে, এক মাসেই দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাট করবে–এটা হতে পারে না। ওষুধের সরবরাহ কমলে কোনো দোকানদার কি বেশি দামে তা বিক্রি করতে পারে। গ্যাস নেই তো নেই। বেশি দাম দিলে মিলবে কেন? ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান বাড়ালে তাদের অপতৎপরতা বন্ধ হবে।’
জানুয়ারি মাসে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। সরকার এলপি গ্যাসের দাম ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সে দামেও কোথাও বিক্রি হচ্ছে না। বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।