শ্রমিক কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে সংকট বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। আট ঘণ্টার কর্মবিরতির সময় দিনে ১৫০০ থেকে ১৬০০ একক কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছিল; কিন্তু অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গত মঙ্গলবার বন্দর থেকে কোনো কন্টেইনারই ডেলিভারি হয়নি। গতকাল বুধবারও একই অবস্থা। যদিও বুধবার সরকারি ছুটির দিন, তবু এটি আশঙ্কার। কারণ সরকারি ছুটির দিনে বন্দরের কার্যক্রম চালু থাকে। কিন্তু কর্মবিরতির কারণে গতকাল ছুটির দিনেও বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
Manual3 Ad Code
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে গতকাল বন্দরে কোনো কন্টেইনার ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট ছিল না। রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার জাহাজীকরণও বন্ধ। আমদানি পণ্য নিয়ে আসা কার্গো জাহাজ থেকেও পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে। এতে বহির্নোঙরে বাড়ছে জাহাজের গড় অবস্থান। কিছুদিন আগেই যেখানে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান শূন্যের কোটায় চলে এসেছিল, কর্মবিরতির কারণে সেটি এখন দিন দিন বাড়ছে।
নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি আট ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিক কর্মচারীরা। এরপর দুই দিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করার পর গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করে শ্রমিকদের সংগঠন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি কর্মসূচি পালনের সময়েই একই দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করে সংগঠনটি। এই কর্মবিরতি এখনও অব্যাহত রয়েছে।
Manual3 Ad Code
শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড, ইয়ার্ডে বন্ধ রয়েছে সব কার্যক্রম। অচলাবস্থা তৈরি হতে চলেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সংগঠন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বিজিএমইএ, চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যবসায়ীরা বৈঠক করেন।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ‘শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে আমরা (তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা) অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এজন্য বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ আমরা ব্যবসায়ীরা আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু তারা সেটি মানছেন না, তারা আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করার জন্য যেসব শর্ত দিচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ আমাদের হাতে নেই। সেগুলো নির্ভর করছে অথরিটির ওপর। এখন অথরিটি যদি এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না করে, তাহলে অনেক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। কর্মবিরতি আরও দুয়েক দিন অব্যাহত থাকলেই আমদানি-রপ্তানির ভয়াবহ ক্ষতি হবে।’
Manual3 Ad Code
এ প্রসঙ্গে বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত আছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে আমরা কিছু শর্ত দিয়েছি। উনারা এগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন। সরকারের সঙ্গে কথা বলে যদি ব্যবসায়ীরা আমাদের শর্তগুলো মেনে নেন, তাহলে আমরা আন্দোলন স্থগিত করব। না হলে আন্দোলন চলবে।’
কর্মবিরতির কারণে বন্দরের বহির্নোঙরে দিন দিন জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল বহির্নোঙরে খোলা পণ্য নিয়ে খালাসের অপেক্ষায় আছে ১৩৩ জাহাজ। অন্যদিকে বন্ধ রয়েছে কন্টেইনার ডেলিভারি। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বন্দরে ৩৭ হাজার ৩১২ একক কন্টেইনার বন্দরে আছে। এর মধ্যে এফসিএল কন্টেইনার আছে ২৯ হাজার ৯০৪ একক। তবে গতকাল বন্দর থেকে কোনো কন্টেইনার ডেলিভারি হয়নি। বন্ধ রয়েছে জাহাজ থেকে কন্টেইনার লোড ও ডিসচার্জ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটররা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, ‘কর্মবিরতিতে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। কাজ করলে আমরা আয় করি, কাজ না করতে পারলে আয় বন্ধ থাকে। গত দুই দিন তো পুরোপুরি কাজ বন্ধ, তাই আমাদের আয়ও বন্ধ। অন্যদিকে বহির্নোঙরে জাহাজ বেশি দিন অপেক্ষায় থাকায় ব্যয় বাড়ছে আমদানিকারকদের।’
তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টায় আমরা একটি জাহাজে ১ হাজার ২০০ একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারি। সেই হিসেবে আট ঘণ্টা বন্ধ থাকলে একটি জাহাজের বিপরীতে ৪০০ থেকে ৫০০ একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কম হয়। আর ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকলে পুরোটাই বন্ধ থাকে। জেসিটিতে গড়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি জাহাজ বার্থিং থাকে। এই হিসেবে এক দিন বন্ধ থাকলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কমে যায় ৩ হাজার ৬০০ একক থেকে ৪ হাজার ৮০০ একক।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কর্মবিরতির কারণে এখন পর্যন্ত দুটি জাহাজের শিডিউল মিস হয়েছে। আর বর্তমানে জেটিতে চারটি কন্টেইনার জাহাজ অবস্থান করছে। আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার ডিসচার্জ এবং রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার লোড বন্ধ থাকার কারণে জাহাজগুলো জেটিতে বসে আছে। জেটিতে অবস্থান করা তিনটি কার্গো জাহাজ থেকেও আমদানি পণ্য আনলোড করা যাচ্ছে না।’
অফডকগুলোর কার্যক্রমেও বিরাজ করছে স্থবিরতা। কর্মবিরতির কারণে বন্দর থেকে অফডকগুলো কোনো কন্টেইনার আনা-নেওয়া হচ্ছে না। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে এখন পর্যন্ত অফডকগুলো থেকে বন্দরে কন্টেইনার আনা-নেওয়া দুটিই বন্ধ আছে। তবে অফডকগুলোয় রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার স্টাফিং অব্যাহত আছে। রপ্তানি পণ্য ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানে করে অফডকে আসছে, সেগুলো নামিয়ে আমরা কন্টেইনার স্টাফিংও করছি। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’
Manual6 Ad Code
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অফডকগুলোয় খালি কন্টেইনার আছে ৫২ হাজার, আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার আছে ৮ হাজার এবং রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার আছে ১১ হাজার।’