নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয় প্রশাসনকে। তাই যেকোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা আবশ্যক। গত তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সাল) নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়নি। ওই নির্বাচনগুলো শেষে সরকারি বিবৃতিতে নিয়মিত ভাবেই দেখা গেছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার বুলি। বিপরীতে জনসমক্ষে প্রমাণিত হয়েছে একপেশে নির্বাচনের জাজ্বল্য উদাহরণ। প্রশাসনের প্রভাব ছিল সেসব নির্বাচনে। তাই এবারও জনমনে আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় কিনা এবং প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত থাকবে কিনা এ নিয়ে রয়েছে সংশয়। তারা বলছেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকবে কি-না তা নির্ধারণ হয় সরকারের দিকনির্দেশনায়।
আসন্ন নির্বাচনে ‘গণভোট’ তথা ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করার জন্য প্রকাশ্যে সরকারের নির্দেশনা থাকায় প্রশ্ন তুলেছে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ২৯ জানুয়ারি ইসির এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট নিয়ে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন, তবে হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে জনগণকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। এ ধরনের আচরণ গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে সরকারি কর্মচারীদের এ কথা জানিয়েছে ইসি। এতে এবারের নির্বোচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অথচ এর আগেই গত ১৮ জানুয়ারি (রবিবার) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মো. সারওয়ার মোর্শেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ‘গণভোট ২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের সব কর্মচারীকে আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশে সচিবালয়, প্রধান কার্যালয়, বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের ভবনগুলোতে গণভোট বিষয়ক ন্যূনতম ২টি ব্যানার (প্রয়োজনে আরও বেশি সংখ্যক) প্রদর্শনের এবং সরকারি যোগাযোগে গণভোটের লোগো প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে।
Manual4 Ad Code
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সব দপ্তর প্রধানদের (প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা এবং মাঠপর্যায়ের) সরকারি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গণভোট বিষয়ে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। সেই প্রচারের ব্যানারে হ্যাঁ-কে জয়যুক্ত করার চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে ভোটারদের জন্য। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক/সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার/পৌরসভা প্রশাসকদের ট্যাগ করে তাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রচার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন স্থল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাসস্ট্যান্ড, ফেরি, লঞ্চঘাট, রেল স্টেশন, এয়ারপোর্টসহ জনবহুল স্থানে নির্বাচনি ব্যানার বা পোস্টার লাগাতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
Manual5 Ad Code
এ পরিস্থিতিতে ইসিকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এরপরও সরকারের নির্দেশনায় প্রশাসন একটি পক্ষাবলম্বন করে নিজেদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তা ছাড়া ইসির নির্দেশনার পরও গণভোটের বিষয়ে সরকার নিজেদের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শর্ট মেসেজ ভোটারদের সেলফোনে পাঠিয়েছে। এবার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকে একদিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক জনপ্রশাসন সচিব বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীরা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী হ্যাঁ বা না প্রচারে যুক্ত হতে পারবেন না। তবে বর্তমান সরকার অধ্যাদেশ জারি করে এই বিষয়টিকে বৈধ করার চেষ্টা করেছে।’
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘গণভোটের প্রচারের বিষয়ে সরকারের নির্দেশ এবং হ্যাঁ বা না ভোটের প্রচার না চালাতে ইসির নির্দেশ রয়েছে। এই দুটো আদেশ পরস্পরবিরোধী। নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যায়িত হওয়া উচিত ছিল। তাই সাবেক সরকারি কর্মচারী হিসেবে মতামত প্রকাশে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করছি। কারণ এ বিষয়ে আমার কি বলা উচিত? সরকার বলছে এটা করা যাবে, আবার ইসি বলছে এটা করা যাবে না। আসলে আমি বিভ্রান্ত।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code
পৃথক প্রশ্নের জবাবে সরকারের সাবেক এই সচিব বলেন, গত তিন নির্বাচনে কর্মচারীরা প্রভাব বিস্তার করেছে, এই অজুহাতে বর্তমান সরকার অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। আবার সরকারই কর্মচারীদের নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার করতে বলছে। অথচ এই নির্দেশনা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এর পরিপন্থি। এতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা হয়েছে। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করা যায় না।