সংবাদ বিজ্ঞপ্তি:
বিয়ানীবাজার উপজেলার ৫ ক্যাটাগরীতে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ ২ জন অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। জীবনযুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘অদম্য নারী’ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত ‘অদম্য নারী-২০২৫ এর সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী কলসুমা বেগম (সুমি) বিয়নীবাজার উপজেলার রামদা বাজার গ্রামের মোঃ আব্দুল রহিম ও জয়নব বেগমের সন্তান। তার বাবা ২য় বিয়ে করায় সৎ মায়ের কুটচালে এক সময় তার মাকে তালাক দেন। তারপর শুরু হয় তার উপর নির্যাতন, উপোস রাখা, স্কুলে যেতে না দেয়া, বাড়ির সব কাজ তাকে দিয়ে করানো। অনেক কষ্টে এস.এস.সি পাস করার পর এইচএসসিতে ভর্তি হলেও সৎ মায়ের কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি। ২০১০ সালে বিয়ানীবাজারের নিদনপুর নিবাসী তারই ফুফাতো ভাই মোঃ জামাল হোসেনের সাথে তার বিবাহ হয়। বিয়ের পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ, বিশেষ করে তার স্বামীকে কর্মক্ষত্রে মনযোগী করা ও বদ অভ্যাসগুলো ত্যাগ করিয়ে বহু কষ্টে তাকে সিএনজি অটো চালনায় মনোযোগী করেন।
Manual6 Ad Code
স্বামীকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ২০১৭ সালে সন্তানদের ভরণ-পোষণের চাহিদা বৃদ্ধি ও পারিবারিক আর্থিক চাপে নতুন আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন কলসুমা বেগম সুমি। নিজের মনের লোকানো স্বপ্নকে জাগ্রত করে প্রবল ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নিয়ে ঘরে বসে অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন আইটেম বিক্রি করে মানুষের বিশ্বাস ও সমর্থন পেয়ে ব্যবসায় বেশ ভালো সাড়া পান এবং ধীরে ধীরে ব্যবসায় উন্নতি হতে থাকে। পরবর্তীতে তিনি ‘সিলেট অনলাইন শপিং’ নামে প্রথম শোরুম প্রতিষ্ঠা করেন বিয়ানীবাজারে।
Manual2 Ad Code
ব্যবসা ক্ষেত্রে বিয়ানীবাজারের মত একটি জায়গায় একজন নারীর পথচলা খুব সহজ ছিল না। সংসারে আর্থিক সমস্যা, সন্তানের ভরণপোষণ, সমাজের বাঁকা কথা সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। মানুষ বলতো “মেয়ে হয়ে ব্যবসা করবে? হবে না!” ব্যবসা করাটা শুরুতে শ্বশুর বাড়ীর কেউ মেনে নিতে চায়নি। শাশুড়ি, দেবর, ননদ, জ্বা সবাই কথা শুনাতো। কিন্তু তিনি ভেঙ্গে পড়েননি, তার বিশ্বাস ছিল তিনি পারবেন। সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে রাত জেগে লাইভ করতেন, একা একা অর্ডার প্যাক করতেন। আজ যেটুকু সফল হয়েছেন সেটা কারো দান নয়, এটা তার পরিশ্রম, গ্রাহকদের ভালবাসা, তার মায়ের দোয়া ও আল্লাহর রহমত।
তিনি বিয়ানীবাজারে ‘অনলাইন শপ সুমি’ নামে দ্বিতীয় শোরুম চালু করেছেন। বর্তমানে তার অধীনে ১০ জন কর্মী কাজ করছেন। তিনি সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রিমিয়াম সদস্য। খুব শীঘ্রই তার নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘অনলাইন শপ বায় সুমি’ লঞ্চ হতে যাচ্ছে যার মাধ্যমে আরও বৃহৎ পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে। তার স্বামীকে একটি গাড়ি কিনে দিয়েছেন। বর্তমানে তার স্বামী সিএনজি অটোরিক্স্া বাদ দিয়ে এক্স ফিল্ডার গাড়ি চালিয়ে উপার্জন করছেন। পাশাপাশি তার পেইজ থেকেও প্রতিদিন ডলার আসছে। তার পেইজের ফলোয়ারস প্রায় পৌনে দুই লক্ষ।
নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী ক্যাগরিতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পারভীন আক্তার বিয়ানীবাজার উপজেলার নাটেশ^র গ্রামের কৃষক মোঃ আব্দুল জলিল ও মাতা আনোয়ার বেগম এর ৬ ছেলে মেয়ের মধ্যে ৩য় সন্তান। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করতে হয়েছে। মেয়ে হয়ে বাবার সাথে কৃষি কাজে সাহায্য করেছেন ও টিউশনি করে যে টাকা আয় করেছি সেই টাকা দিয়ে ভাই বোনের পড়ালেখার খরচে ব্যয় করতেন। তিনি জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০০৩ ইং সালে এস এস সি পরীক্ষার পর টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরীক্ষার পর তিন মাস লেডিস সেলাই প্রশিক্ষণে গ্রহণ করেন। প্রাইভেট পড়ানো টাকা থেকে সঞ্চয়কৃত টাকা দিয়ে ১টি সেলাই মেশিন কিনে কাজ শুরু করেন। সেলাই করে যে টাকা আয় হতো তা পরিবারের পিছনে ব্যয় করেছেন।
২০০৫ সালে নাটেশ্বর গ্রামের ইউসুফ আলীর সাথে পারভীন আক্তারের বিবাহ হয়। বিবাহের কয়েক মাস পর এক লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে তার স্বামী। তার বাবার পারিবারিক অবস্থা খারাপ থাকায় তিনি এক লক্ষ টাকা যৌতুক দিতে অস্বীকার করেন এতে তার শাশুড়ী ও স্বামী তাকে শারীরিক ও মানষিক ভাবে নির্যাতন শুরু করে। শারীরিক নির্যাতনের কারণে তার শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে পারভীন আক্তার ধৈর্য্য ধরে সংসার চালিয়ে গেছেন।
বিয়ের ২ বছর পর প্রথম ছেলে সন্তান জন্ম হয়। এরপর আরো ২টি মেয়ে ও ১টি ছেলের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে সংসার বড় হওয়ায় এবং স্বামী বেকার থাকার কারণে তাদেরকে যৌথ পরিবার থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় সংসারের ভরণ পোষণ ও বাচ্চাদের পড়ালেখা খরচ বহন করতে পারভীন আক্তার সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। সেলাইয়ের কাজ থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে ৪ ছেলে মেয়ের খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, পড়ালেখার খরচ বহন শেষে একটি বিদ্যুৎ চালিত সেলাই মেশিন, লক মেশিন ও বাটারফ্লাই মেশিন কিনেন। পাশাপাশি তিনি মেয়েদের দর্জি প্রশিক্ষণ দেন। স্বামী বেকরত্ব দূর করতে তিনি চারখাই বাজারে একটি লেপ-তুষকের দোকান ও তুলা দুনার জন্য মেশিন স্বামীকে কিনে দেন।
পারভীন আক্তার ও তার স্বামী দু’জনে উপার্জন করায় বর্তমান তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। অনেক বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করে এ পর্যায় পারভীন আক্তার আসতে পেরেছেন। তিনি চান তার মত নির্যাতিত মেয়েরা যেন সংগ্রাম করে নতুন জীবন গড়তে পারে। প্রতিটি নারী যেন স্বামীর সংসারে থেকে তার মত জীবন যুদ্ধ করে জয়ী হয় এই প্রত্যাশা। তিনি একজন নির্যাতিত সংগ্রামী মহিলা হিসেবে মাথা উচু করে দাড়িয়েছেন।
Manual2 Ad Code
সকল সমস্যাকে পিছনে ফেলে একা সামনে এগিয়ে যাওয়া শিখেছেন। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন। পারভীন আক্তার ভাবেন তিনি নারী, তিনি সাহসী, তিনি অপরাজিতা। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী।