অভিন্ন নদী তিস্তার পানি ভাগাভাগি কীভাবে হবে তার কাঠামো ঠিক হয়েছে ১৫ বছর আগে, ২০১১ সালে। নদী অববাহিকার দুই দেশ বাংলাদেশ ও ভারত কে কতটুকু পানি পাবে, কীভাবে পাবে, তাও স্থির হয়েছে তখন। একই বছর এ বিষয়ে ১৫ বছর মেয়াদের একটি চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। বেশ খরস্রোতা এ নদীটির অনেক জল এরই মধ্যে উজান থেকে ভাটির দিকে বয়ে গেলেও চুক্তিটি আজও হয়নি।
এই দীর্ঘ সময়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে পরিবর্তন এসেছে। মনমোহন সিংয়ের কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়ে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায়, তাও ১২ বছর হয়ে গেল। সাবেক ও বর্তমান এই দুই সরকারের একটি মিল হলো তিস্তা সমাধান কেবল আশ্বাসেই সীমিত রেখেছে তারা। কেন চুক্তিটি করল না, তার কারণও একই দেখিয়েছে উভয়েই।
Manual4 Ad Code
পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আপত্তির কথা বলেছে দুই কেন্দ্রীয় সরকারই।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার এবারকার নির্বাচনে তৃণমূল দলটি নেত্রী মমতা ব্যানার্জিসহ ভরাডুবির শিকার হয়েছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপিরই পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নেওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এতে তিস্তা চুক্তিটি না করার ক্ষেত্রে দেখানো মূল অজুহাতের অবসান হয়েছে, এমনটি মনে করছেন বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তিস্তা চুক্তি সইয়ের সুযোগ আছে।
পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান বলেন, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে প্রাদেশিক সরকারে নির্বাচিত হয়ে আসায় তিস্তা ও গঙ্গাসহ পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো নিয়ে আলোচনা কিছুটা সহজ হতে পারে। কাজেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তিস্তা চুক্তি হতে পারে। তিনি মনে করেন, গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
অবশ্য বাংলাদেশের কূটনীতিকরা মনে করেন, ঢাকায় গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ও ক্ষমতায় পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বর্তমান যে হালচাল, তাতে তিস্তা চুক্তি সই খুব সহজে না হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীর বাংলাদেশ অংশে জল ধরে রাখাসহ অন্যান্য সুবিধা তৈরির জন্য একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে কথা হচ্ছে। সমস্যা হলো, মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নেওয়ার আলাপ চলছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতিযোগী চীনের সঙ্গে। মহাপরিকল্পনার প্রকল্পগুলো সীমান্ত থেকে তুলনামূলকভাবে ‘কাছাকাছি’ ও ‘চীনাদের দ্বারা’ বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় এ বিষয়ে ভারত আপত্তি করেছে।
Manual4 Ad Code
ভারতীয় বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে প্রাদেশিক সরকারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করা সম্ভব। তবে সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকায় নরেন্দ্র মোদির সরকার এক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেয়নি।
ঢাকায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের আশ^াস ও আপত্তির ওপর ভরসা করে বাংলাদেশ আর কত কাল অপেক্ষায় থাকবে, এমন প্রশ্নও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আছে।
Manual4 Ad Code
পশ্চিমবঙ্গে মমতা-বাধা অপসারিত হওয়ায় ও বিজেপি নির্বাচিত হয়ে আসায় তিস্তার পানি চুক্তি সইয়ের বিষয়ে আশাবাদী কি না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা কী ভাবছেন, কী করবেন, সেটা তারা যদি না জানান, তাদের মন বোঝার (মাইন্ড রিড) কাজ আমার না।’
২০১১ সালে চুক্তিটি যেভাবে সইয়ের বিষয়ে একমত হওয়া গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেভাবে সই করার বিষয়টি দুই দেশ বিবেচনা করবে, এমন ‘প্রত্যাশা’ ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সে জন্য তো বসে থাকলে চলবে না; আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে।’
২০১১ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। মমতা ব্যানার্জির আপত্তির অজুহাত দেখিয়ে মনমোহন সিংয়ের সরকার শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যায়। এ কারণে ৬ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিংয়ের অবতরণের কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকায় দেশটির হাইকমিশনার রাজিৎ মিত্তারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে প্রতিবাদ জানানো হয়।
২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারতে শেখ হাসিনার সরকারি সফরে তাকে পাশে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের দুজনের সরকারের দ্বারা তিস্তা সমস্যার সমাধান দ্রুত খুঁজে বের করার নিশ্চয়তা দেন। উভয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এরপরও ঢাকা ও দিল্লি সফর করেছেন। কিন্তু মোদির নিশ্চয়তা সত্ত্বেও গত ৯ বছরে চুক্তিটি সই হয়নি।
এর আগে ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকায় দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে পানিসম্পদ সচিবরা শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি ভাগাভাগির জন্য একটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির কাঠামো সইয়ের বিষয়ে একমত হন। ভারতের তদানীন্তন পানিসম্পদ সচিব ধ্রুব বিজয় সিং ঢাকায় সেদিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা একটি কাঠামোতে সম্মত হয়েছি। কিন্তু আমাদের কিছু সূক্ষ্ম সমন্বয় করতে হবে।’
সম্মত কাঠামো অনুযায়ী, তিস্তা নদীর জন্য প্রাকৃতিক প্রবাহ হিসেবে ২০ শতাংশ পানি সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট পানি দুই দেশ সমান ভাগে ভাগ করতে রাজি হয়। পশ্চিমবঙ্গে গজলডোবা পয়েন্টে এই ভাগাভাগি হওয়ার কথা রয়েছে।
কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চুক্তির ‘সূক্ষ্ম সমন্বয়’ করতে উভয়পক্ষ একমত হলেও ভারতের অনাগ্রহের কারণে ঠিক তিস্তা চুক্তির বিস্তারিত বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রীদের বৈঠক গত ১৫ বছরে আর হয়নি। বাংলাদেশের অনেক অনুরোধে ১২ বছর বিরতির পর ২০২২ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রীদের একটি বৈঠক হলেও সেখানে তিস্তা নিয়ে কথা হয়নি।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এরমধ্যে কেবলমাত্র গঙ্গার পানিবণ্টনের জন্য ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদের একটি চুক্তি হয়েছে। এ চুক্তিটির মেয়াদ চলতি বছর ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে।
গতকাল চীন সফরে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বেইজিং সফরে ‘অবশ্যই’ আলোচনা হবে।
ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সই আটকে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৯ সালের চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়। চীন তিস্তা প্রকল্প বিষয়ে একটি সমীক্ষা চালায় এবং প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রস্তাব বাংলাদেশকে দেয়।
চীন পরিচালিত সমীক্ষাটি ‘প্রাথমিক পর্যায়ের’, এমনটি মনে করেন বাংলাদেশের অনেক বিশ্লেষক। মালিক ফিদা খান এ বিষয়ে বলেন, ‘খাড়া ঢালের’ (স্টিপ সেøাপ) খরস্রোতা নদী তিস্তার গতিপথ গত ২০০ বছরে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এমন বৈশিষ্ট্যের নদীকে বেশ সংকুচিত করে নানামুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত সমীক্ষা করা দরকার। তা না হলে ঝুঁকি থেকে যাবে।
২০২৪ সালের ভারতও তিস্তা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে।
তিস্তা চুক্তি সই ও প্রকল্প গ্রহণের অনিশ্চয়তার মধ্যে গতকাল বেইজিং গেলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। রওনা হওয়ার আগে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই তিস্তার কথা হবে।’
তিস্তা অঞ্চলের সমস্যার সমাধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অঙ্গীকার, এ দিকটি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তিস্তা পাড়ের মানুষ বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। এটা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। দেশের ও মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকারে রেখে সরকার সমস্যাটি সমাধানের সর্বোত্তম সমাধান দেবে।
আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের চীন সফরের সম্ভাবনার দিকটি জানিয়ে তিনি বলেন, সেই সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।
তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের আমলে হবে কি না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সে বিষয়ে ভারত সিদ্ধান্ত নেবে।