টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেন। একই সময়ে দলটির কেন্দ্রীয় ও শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা দেশের বাইরে চলে যান এবং তৃণমূল পর্যায়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী আত্মগোপনে থাকেন।
হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির তিন দিন পর ৮ আগস্ট রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তার সরকার ধীরে ধীরে দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা আইনত বন্ধ হয়ে যায়।
এ সময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা ও মন্ত্রী গ্রেফতার হন। এর ফলে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। তবে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি সরকার গঠন করার পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট আকারের মিছিল, পোস্টারিং ও সীমিত রাজনৈতিক তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
Manual7 Ad Code
এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও কৌতূহল বৃদ্ধি পেয়েছে। দলটি এ উপলক্ষে টানা কয়েক দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্ভাব্য কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সতর্ক অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর থেকে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিদের কাছে পাঠানো একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় দলীয় পতাকা উত্তোলন, প্রতীকী মিছিল বা সমাবেশের চেষ্টা হতে পারে। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান বা উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট, টহল ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং তা আরও বাড়ানো হবে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার আশঙ্কা নেই বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে শুধু দলটির অভ্যন্তরীণ কর্মসূচিই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থানও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও এ সময়ে মাঠে সক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে কিছু এলাকায় পাল্টাপাল্টি অবস্থান বা উত্তেজনার পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছোট আকারের মিছিল, পোস্টারিং ও সীমিত রাজনৈতিক কর্মসূচি লক্ষ করা গেছে। এসব ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্রেফতারও হয়েছে বলে জানা যায়। এর ধারাবাহিকতায় প্রশাসন মনে করছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির চেষ্টা হতে পারে।
Manual4 Ad Code
এ কারণে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম এলাকা, শাহবাগ, ফার্মগেট, মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও বিশেষ নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
Manual1 Ad Code
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, জাতীয় দিবস বা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিনগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক কর্মসূচি ও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও ২৩ জুন একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যা দলীয় কর্মীদের মধ্যে সাংগঠনিক ও আবেগগত উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাদের মতে, পরিস্থিতি কতটা শান্তিপূর্ণ থাকবে বা উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণের ওপর। যদি কর্মসূচি সুসংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হয়, তবে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকতে পারে। তবে একাধিক পক্ষ মাঠে সক্রিয় হলে উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়বে।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন, বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা ও দোয়া, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, দেশের সব মসজিদে দোয়া মাহফিল, ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা এবং বিভিন্ন স্থানে পতাকা মিছিল ও আলোচনা সভা।
Manual6 Ad Code
এ ছাড়া দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ও সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করবে বলে জানা গেছে। এসব কর্মসূচিকে দলটির সাংগঠনিক সক্রিয়তা পুনরায় দৃশ্যমান করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।