প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

গ্রিস ও শ্রীলঙ্কার উত্থান-পতনের ‘সার্বভৌম বন্ড’ নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ

editor
প্রকাশিত জুলাই ৭, ২০২৬, ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ
গ্রিস ও শ্রীলঙ্কার উত্থান-পতনের ‘সার্বভৌম বন্ড’ নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল গ্রিস ও শ্রীলঙ্কা। তবে বেইলআউট সুবিধার আওতায় সেই সংকট ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠেছে দেশ দুটি।
এই সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার তার পুরো সময়ে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। তবে সহজ শর্তের বিদেশি ঋণের সরবরাহ কমে আসায়, বিএনপি সরকার বিকল্প অর্থের যোগান দিতে সেই সার্বভৌম বন্ড নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।
এরই মধ্যে ‘পান্ডা বন্ড’ নামের একটি সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়ে চীনের কাছ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসও পেয়েছে বাংলাদেশ।

Manual1 Ad Code

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

দেশে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়টি প্রথম বড় ধরনের আলোচনায় আসে ২০১২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে। তবে ভয়টা ধরিয়ে দিয়েছিল গ্রিস।
সার্বভৌম ঋণ সংকটে দেশটিতে তখন বড় ধরনের অস্থিরতা চলছিল। জনগণের করের টাকা দিয়ে পাহাড়সম ঋণ পরিশোধের প্রতিবাদে গ্রিসের সাধারণ মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তখন ড. আতিউর রহমান। সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের একটি আলোচনায় গ্রিসের এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি আমলে নিয়ে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত তুলে ধরা হয়। তবে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর শঙ্কার দিকটা বিবেচনায় নিয়ে সার্বভৌম বন্ড থেকে পিছিয়ে আসেন।

পরবর্তীতে সার্বভৌম বন্ডের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়।

বড় ধরনের সেই অর্থনৈতিক ধাক্কার পর বেইলআউট সুবিধা নিয়ে গ্রিস ও শ্রীলঙ্কা উভয়ই এই সংকট কাটিয়ে ওঠে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সতর্কতার সঙ্গে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।

সম্প্রতি নতুন করে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি সরকার।

সরকারি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে এই সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতি সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে ১২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় এসে দাঁড়ায়।

জানা গেছে, সরকারের ক্রমবর্ধমান অর্থায়ন চাহিদা, প্রথাগত অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে নমনীয় উৎসের বৈদেশিক অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের সভাপতি অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য আহ্বান জানান।

বৈঠকের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কমিটি সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করবে এবং প্রথম আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড ইস্যু সম্পর্কে সুপারিশ তৈরি করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে।

এর আগে যখন প্রথম সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার আলোচনা শুরু হয়, তার কয়েক মাস আগে (২০১১ সালের ১০ অক্টোবর) দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করেছিল বিশ্বব্যাংক। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি থেকে নিজস্ব অর্থায়নে হলেও এই সেতু নির্মাণে তৎপর হয়ে ওঠে।

তখনও দেশে ‘সার্বভৌম সম্পদ বন্ড’ ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সরকারি পর্যায়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

সে সময় পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক দেশই আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ তুলেছিল। এর মধ্যে রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, গ্রিস অন্যতম। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানও এ ধরনের বন্ড ছেড়ে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়েছিল।

 

এবারের প্রেক্ষাপট অনেকটা ভিন্ন

Manual5 Ad Code

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন অর্থায়নের চাহিদা এবং প্রথাগত নমনীয় উৎসের অর্থায়নের সংকোচনের প্রেক্ষাপটে অর্থায়ন উৎসের বিকল্প পর্যালোচনা করা সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন।

বৈঠকে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ম্যাক্রো ও টিডিএম) চারটি বিকল্প অর্থায়ন—অভ্যন্তরীণ ঋণ বাজারে বৈদেশিক বিনিয়োগ, অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং সার্বভৌম বন্ড ইস্যু সম্পর্কে একটি স্লাইডভিত্তিক উপস্থাপনা পেশ করেন।

উপস্থাপনায় বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার যুক্তি, সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর পটভূমি, সম্ভাব্য সুবিধা এবং মূল ঝুঁকিগুলো তুলে ধরা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, ঋণকৃত অর্থের ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক আয় বন্ডের সার্বিক ব্যয়ের (কুপন, স্প্রেড ও ফি) চেয়ে বেশি হওয়া টেকসই অর্থায়নের মৌলিক শর্ত।

বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব বলেন, প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করেছে। আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে বাংলাদেশের পদচিহ্ন স্থাপনের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

তিনি আরও জানান, এই প্রক্রিয়ায় আইএমএফের কিছু উদ্বেগ থাকতে পারে, বিশেষত রেয়াতি ঋণের যোগ্যতা-সংক্রান্ত বিষয়ে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব জানান, বাংলাদেশ যদি পান্ডা বন্ড ইস্যু বিবেচনা করে, তাহলে চীন সহায়তা করতে আগ্রহী।

অর্থ সচিব জানান, অতীতে অর্থ বিভাগ বন্ড ইস্যু-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বিবেচনায় এ বিষয়ে উৎসাহী ছিল না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনরায় বিষয়টি যাচাই করা যেতে পারে। তার মতে, যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বাংলাদেশের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং উন্নত করা প্রয়োজন, যাতে বাজারে অনুকূল সুদের হারে বন্ড ইস্যু করা সম্ভব হয়।

Manual4 Ad Code

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যেহেতু বাংলাদেশের জন্য এটি হবে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড, সে কারণে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং বন্ডের কাঠামো, ইস্যুর সময়, মুদ্রা, পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান মতামত দেন, প্রচলিত ইউএস ডলারভিত্তিক ইউরোবন্ডের পাশাপাশি চীনা রেনমিনবি (আরএমবি) মুদ্রায় পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রথম ইস্যুটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিমাণে রাখা বিচক্ষণ হবে—আনুমানিক ৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার সমতুল্য, যাতে বাজারের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা যায় এবং ঝুঁকি সীমিত পর্যায়ে রাখা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে নিজেকে উপস্থাপন ও বিপণন শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়। তার মতে, বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না বিধায়, বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে স্প্রেড খুব একটা অতিরিক্ত হবে না। তদুপরি, আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণ রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছে ইতিবাচক সংকেত পাঠাবে এবং দেশের সার্বভৌম রেটিং উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রথম বন্ড ইস্যুর কথা বিবেচনা করলে তা ডলারে করা সমীচীন হবে, কারণ অন্য মুদ্রার বন্ডে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বা আগ্রহ কম।

বৈঠকে আলোচনা হয় যে, আসন্ন মধ্যমেয়াদি ঋণ কৌশল, বার্ষিক ঋণ পরিকল্পনা এবং ঋণ ধারণ সক্ষমতা যাচাইয়ে ইউরোবন্ড বা আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা সমীচীন হবে। বৈঠকে সবাই একমত হন যে, বাজার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আগাম ইঙ্গিত প্রদান করা যৌক্তিক হবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করার বিবেচনায় প্রকাশনাগুলোতে এ-সংক্রান্ত ইঙ্গিত দেওয়া ফলপ্রসূ হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত। বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশে ইক্যুইটি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গঠনের একটি উদ্যোগ চলমান রয়েছে। হংকংভিত্তিক এই ফান্ড গঠিত হলে ব্যক্তিখাতে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মূলধন হিসেবে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রস্তাবিত এই ইক্যুইটি ফান্ডের সমান্তরালে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা বিষয়ে অনুসন্ধান চলতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্যরা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করেন।

সার্বভৌম বন্ড কি?

সার্বভৌম বন্ড একটি বিশেষ ধরনের বন্ড, যা সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বিক্রি করার অধিকার রাখে এবং এর মধ্য দিয়ে সেই রাষ্ট্র অর্জিত বিদেশি মুদ্রা ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ ঘাটতি মোকাবেলায় কাজে লাগায়।

সরকারের আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি হয়ে গেলে অনেক দেশ সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয় পরিচালনা করে।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। বাংলাদেশ সরকার স্থানীয়ভাবে ট্রেজারি বন্ডসহ অন্যান্য যেসব বন্ড ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, তা মূলত দেশের অভ্যন্তরে এবং টাকায় ইস্যু করা হয়। অন্যদিকে, সার্বভৌম বন্ড কেনাবেচা হয় বৈদেশিক মুদ্রায়, আন্তর্জাতিক বাজারে। এর ক্রেতা হতে পারে যে কেউ—কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ এবং আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক।

গ্রিস ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা

২০০৪ সালে সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রীলঙ্কা আশা করেছিল দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্নির্মাণের জন্য বিদেশি সাহায্য পাবে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে শ্রীলঙ্কা বুঝতে পারে যে যেই হারে বিদেশি সাহায্য প্রথম দিকে এসেছিল, তা ছিল সাময়িক এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ অর্থের। তখন শ্রীলঙ্কা বন্ডের শরণাপন্ন হয়। ২০০৫ সালে প্রথম দেশের বাজারে ডেভেলপমেন্ট বন্ড হিসেবে ছেড়ে, শেষে ২০০৭ সালে প্রথম সার্বভৌম বন্ড ছাড়ে। ওই বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বন্ড ছেড়ে প্রায় তিনগুণ অর্থাৎ দেড় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বন্ড ক্রেতা পায় শ্রীলঙ্কা। তারপর ২০০৯, ২০১০ এবং ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কা যথাক্রমে ৫০০ মিলিয়ন, ১ বিলিয়ন ও ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বন্ড বাজারে ছাড়ে।

২০১৯ সালের শেষ নাগাদ শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশই চলে যায় বাণিজ্যিক ঋণের (প্রধানত সার্বভৌম বন্ড) অধীনে। এর বিপরীতে, চীন, জাপান বা বিশ্বব্যাংকের মতো দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহজ শর্তের ঋণের পরিমাণ ছিল আনুপাতিক হারে কম। রাজাপাকসে সরকারের আমলে বড় ধরনের কর হ্রাস, কৃষিতে হঠাৎ রাসায়নিক সার বন্ধের মতো ভুল নীতি এবং কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশটির পর্যটন ও রেমিট্যান্স আয় ধসে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেডিট রেটিং কমে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কার নতুন করে ঋণ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালের মার্চে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে আসে মাত্র ১৯ কোটি ডলারে। এর ফলে ওই বছরের মাঝামাঝি এসে প্রদেয় ১০০ কোটি ডলারের সার্বভৌম বন্ড পুনঃপরিশোধসহ মোট ঋণের দায় মেটাতে ব্যর্থ হয়ে সরকার খেলাপি হয়।

বন্ড ও বৈদেশিক ঋণ সংকটের জেরে দেশটিতে নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে গণ-আন্দোলন ও সরকার পতনের রূপ নেয়। তবে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এবং বিশ্বব্যাংক দেশটিকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

গ্রিসও একই ভাবে সার্বভৌম বন্ড নিয়ে বিপদে পড়েছিল। ২০০১ সালে গ্রিস ইউরোপীয় একক মুদ্রা ‘ইউরো’ গ্রহণ করার পর তাদের সার্বভৌম বন্ডের গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি বেড়ে যায়। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনামের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা গ্রিসকে জার্মানির সমান নিরাপদ মনে করে খুব কম সুদে দেদারসে ঋণ দিতে শুরু করে, যা গ্রিসকে ঋণের পাহাড়ে ডুবিয়ে দেয়।

২০০৮ সালে গোটা বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক মন্দা প্রত্যক্ষ করছে, তখন গ্রিসের ঋণ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৯-এর ডিসেম্বরে যখন গ্রিসের রেটিং এ মাইনাস থেকে নেমে বিবিবি প্লাস-এ নেমে যায়, তখন বোঝা যায় ঋণ পাওয়ার জন্য ভালো রেটিং পেতে ভুল তথ্য দিয়ে আসছিল গ্রিস।

২০০৯-২০১০ সালে ঋণ সংকটে পড়ার পর গ্রিস আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৪ বছর পর, ২০১৪ সালের এপ্রিলে তারা প্রথম সীমিত পরিসরে ৫ বছর মেয়াদি বন্ড ইস্যু করে প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরো ঋণ নেয়। তিনটি আন্তর্জাতিক বেইলআউট প্যাকেজের অধীনে থাকার পর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে গ্রিস পুনরায় সফলভাবে ৫ বছর মেয়াদি সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে ঋণ বাজারে ফেরে। এরপর ২০১৮ সালে বেইলআউট পিরিয়ড শেষ হলে ২০১৯ সালে তারা প্রথম ১০ বছর মেয়াদি বন্ড ইস্যু করে।

এই বন্ড ছেড়ে গ্রিস বা শ্রীলঙ্কা যখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, তখন দেশগুলোকে সাধারণ মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকা দিয়ে এর খেসারত দিতে হয়েছে। বেসরকারিকরণ, মূল্যস্ফীতি, বর্ধিত ট্যাক্স, সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট খর্ব করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সেবা খাতের বাণিজ্যিকীকরণ—এই সব কিছু আঘাত করে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে।

Manual7 Ad Code

এমন পরিস্থিতিতে একটা ঋণ পরিশোধ করতে আরেকটা ঋণ নিতে হয় এবং তখন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেডিট রেটিং কমে যাওয়ায় আরও অধিক সুদে বন্ড বিক্রি করতে হয়।

১৯৯৮ সালে রাশিয়া, ১৯৯৯ থেকে ২০০২ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা এবং আশির দশকে ইন্দোনেশিয়া সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে।

ক্রেডিট রেটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কোনো দেশ সার্বভৌম বন্ড বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রথমে যাচাই করে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এর রেটিং কেমন। বর্তমান অর্থনৈতিক নীতি এবং ঋণ পরিশোধের পূর্ববর্তী রেকর্ড (ঋণ ও জিডিপির অনুপাত) দেখে যদি দেখা যায় যে সেই দেশের ঋণ পরিশোধের রেকর্ড ভালো, তাহলে সেই দেশ ভালো রেটিং পায়। আর তার পূর্বের রেকর্ড খারাপ থাকলে তার রেটিং আসে কম। এভাবে পৃথিবীর তিনটি বড় বড় ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি প্রতি বছর বিভিন্ন দেশকে ক্রেডিট রেটিং দিয়ে থাকে। এই ধরনের সেবা দিয়ে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো যেমন দেশগুলো থেকে বিপুল আয় করে, তেমনি দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুসারে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর শরণাপন্ন হয়। যদি কোনো দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি বা বাজেট ঘাটতি হয় এবং অর্থায়নের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন দেশগুলো বন্ড ছাড়তে উদ্যোগী হয়। ক্রেডিট রেটিং ভালো থাকলে দেশগুলোর জন্য বন্ড বিক্রি সহজ হয়, কারণ তখন বেশি বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়।

স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’স, মুডিস ও ফিচ এ ধরনের রেটিং করে থাকে।

মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে ‘বি-টু’ পর্যায়ে নির্ধারণ করেছে। অপরদিকে ফিচ দেশের বর্তমান ঋণমান ‘বি প্লাস’ এ অপরিবর্তিত রাখলেও, পূর্বাভাস কমিয়ে ‘ঋণাত্মক’ করেছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের নিরীক্ষায় এতদিন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং ছিল ‘বিবি মাইনাস’। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এ ঋণমান কমিয়ে ‘বি প্লাস’ করা হয়। স্বল্প মেয়াদে ঋণমান অপরিবর্তিত (বি) রাখার পাশাপাশি আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ রেখেছে সংস্থাটি।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code