প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

শিল্পের ছাদে বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিডের অর্ধেক খরচ

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ণ
শিল্পের ছাদে বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিডের অর্ধেক খরচ

Manual3 Ad Code

 

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

শিল্প-কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের। বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, জ্বালানিসংকট এবং উৎপাদন খরচ কমানোর তাগিদে গত দুই বছরে বড় শিল্প-কারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের স্থাপন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে। এর বেশির ভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায়।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রায় অর্ধেক। বর্তমানে শিল্পে গ্রিডের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ১২ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে।
সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সেটি ১৬ টাকার কাছাকাছি ওঠে। বিপরীতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ হচ্ছে ৪ থেকে ৮ টাকা। ফলে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছেন শিল্প মালিকরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পাঁচ বছর আগে ছাদে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে খরচ হতো প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
এখন তা কমে প্রায় ৪ কোটি টাকায় নেমেছে। আর জমিতে একই ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে খরচ পড়ে প্রায় ৮ কোটি টাকা। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতির দাম কমে আসায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়ছে।

ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে তাদের কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সাতটি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।
নতুন করে সিরামিক, তৈরি পোশাকসহ ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। বাকি ৮ মেগাওয়াট আগামী বছর উৎপাদনে আসবে।

ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, ‘জ্বালানিনিরাপত্তা এবং বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপের কারণে তাঁরা দ্রুত সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছেন। নতুন প্রযুক্তির কারণে এখন আগের তুলনায় কম সময়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যাচ্ছে। তাঁদের কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ হচ্ছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।’

ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্প-কারখানাগুলোতে গত এক দশকে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুরু হলেও গত তিন বছরে এ বিনিয়োগ বেড়েছে। জ্বালানিসংকট প্রকট হওয়া এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় শিল্প মালিকরা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, শিল্প-কারখানার ছাদে স্থাপিত বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই গত দুই বছরে স্থাপন করা হয়েছে।’

Manual1 Ad Code

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। তবে সংস্থাটির হিসাবে, ২৩৯টি বড় শিল্প-কারখানার ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াট। ছোট স্থাপনার ছাদও হিসাবের আওতায় এলে দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।

Manual1 Ad Code

 

 

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও তাদের কারখানাগুলোতে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কারখানার ছাদে ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ২০টি কারখানায় ইতিমধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চলতি বছর আরো অন্তত ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুটি কারখানা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

Manual3 Ad Code

আকিজ বশির গ্রুপের জনতা জুট মিলে ২১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে। এতে মিলটির বিদ্যুতের চাহিদার শতভাগ পূরণ হচ্ছে। হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের কারখানার ছাদে স্থাপন করা হয়েছে ১৩ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট। এর মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সিস্টেম রয়েছে। ফলে রাতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারছে কারখানাটি। সব মিলিয়ে আকিজ বশির গ্রুপ বর্তমানে ছাদ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। আরো ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) বিভিন্ন কারখানার ছাদে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এতে তাদের কারখানাগুলোর মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। নতুন করে আরো ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।

এ বিষয়ে এমজিআইয়ের পরিচালক তানভীর মোস্তফা বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার তাঁদের অগ্রাধিকার। কারখানার ছাদ ছাড়াও ভবনের সম্মুখভাগ, সীমানাপ্রাচীর ও সড়ক বিভাজকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উপায় খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যান চালু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে এলপিজি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০০টি শিল্প-কারখানার ছাদে ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। বর্তমানে আরো ১২টি শিল্প-কারখানায় কাজ চলছে। এসব প্রকল্প চালু হলে আরো ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

ওমেরা সোলারের সিইও মাসুদুর রহমান বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে গত দুই বছরে শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। একটি সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট ২০ থেকে ২৫ বছর চলে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বড় ব্যয় নেই। গ্রিডের তুলনায় উৎপাদন খরচ অর্ধেক বা তার কম হওয়ায় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে।

Manual8 Ad Code

সৌরবিদ্যুতের প্ল্যান্টের জীবনকাল ২০ থেকে ২৫ বছর। একবার বিনিয়োগ করার পর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বড় ধরনের ব্যয় থাকে না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও কমে আসে। রাইজিং গ্রুপের ছয়টি কারখানায় ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে দুটি পোশাক কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে।

 

 

তবে শিল্পকারখানার বিদ্যুতের পুরো চাহিদা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সাধারণত মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হয়। কোনো কোনো কারখানায় এ হার আরো বেশি। দিনে কয়েক ঘণ্টা কারখানার কার্যক্রম চালাতেও সহায়তা করছে এই বিদ্যুৎ। এতে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমছে।

শিল্পে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা থাকলেও অর্থায়ন এখনো বড় বাধা। বিজিএমইএর ৪২৪টি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে মালিকেরা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাঁরা। বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপের কারণে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের তাগিদ বাড়ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৫ শতাংশ এবং ইডকল থেকে ৬ শতাংশ সুদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ইডকলের ঋণের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সুদের হার আরো কমানো অথবা ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো হলে মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলোও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।

 

 

সিপিডির এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আরও ১ হাজার ৩০০ কারখানায় দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। অর্থায়ন সহজ করা গেলে শিল্প-কারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৫ শতাংশ এবং ইডকল থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ মিললেও ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। সুদ কমানো বা ঋণ পরিশোধের সময় ৯ বছর করা হলে মাঝারি শিল্পও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করতে পারবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code